পাটুয়াটুলী–নবাবপুর থেকে ইউটিউব, বাংলাদেশের গানের বাজারের দুই দশকের রূপান্তর

· Prothom Alo

বাংলাদেশের গানের বাজার কি তবে ‘নাই’ হয়ে যাবে? একসময় সংগীতাঙ্গনে এই প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যেত। নবাবপুর–পাটুয়াটুলীর অডিও বাজার যখন একের পর এক দোকান হারাচ্ছিল, ক্যাসেট ও সিডির ব্যবসা যখন প্রায় বিলুপ্তির পথে, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন দেশের সংগীতশিল্পের বাণিজ্যিক অধ্যায়ের বুঝি সমাপ্তি ঘটতে চলেছে। কিন্তু বিশ্ব সংগীত দিবসে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালে দেখা যায়, গল্পটি হারিয়ে যাওয়ার নয়; বরং রূপান্তরের। নবাবপুরের ক্যাসেটের র‍্যাক থেকে ইউটিউবের প্লেলিস্টে, পাটুয়াটুলীর পোস্টার থেকে ডিজিটাল থাম্বনেইলে—বাংলাদেশের গান এখন স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে বৈশ্বিক শ্রোতার কাছে। সরেজমিনে পুরোনো অডিও বাজার ঘুরে এবং ডিজিটাল দুনিয়ার বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু গান থেমে নেই। লিখেছেন মাসুম অপু

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

শনিবার দুপুরে মোটরবাইকে চড়ে পুরান ঢাকার নবাবপুর ও পাটুয়াটুলী ঘুরে বেড়ালাম কয়েক ঘণ্টা। চারদিকে মানুষের ভিড়, দোকানির হাঁকডাক, পণ্য ওঠানামার ব্যস্ততা। শুধু নেই একসময়কার সেই পরিচিত শব্দ—গান। যে এলাকায় একসময় নতুন অ্যালবামের গান ভেসে আসত দোকান থেকে দোকানে, ঈদ এলেই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ত, সেখানে এখন গানের কোনো চিহ্নই প্রায় চোখে পড়ে না।
নব্বই দশকের শেষভাগ থেকে দুই হাজার সালের শুরুর দিকে বিনোদন সাংবাদিক হিসেবে এই এলাকায় কতবার যে এসেছি, তার হিসাব নেই। ঈদের আগে এলে তো কথাই ছিল না। নতুন অ্যালবাম প্রকাশের মৌসুমে পুরো এলাকা যেন এক বিশাল সংগীতমেলায় পরিণত হতো। এক দোকান থেকে বাজছে আইয়ুব বাচ্চুর গান, আরেক দোকানে জেমস, কোথাও নতুন ব্যান্ড অ্যালবাম, কোথাও আবার আসিফ আকবর বা হাবিব ওয়াহিদের নতুন গান। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই বোঝা যেত কোন শিল্পীর নতুন অ্যালবাম বের হয়েছে।
আশির দশক থেকে দুই হাজার সালের শুরুর দিক পর্যন্ত নবাবপুর, পাটুয়াটুলী, চট্টগ্রামের রেয়াজউদ্দিন বাজার ও খুলনার নিউমার্কেটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল দেশের অডিও শিল্প। বছরে শতকোটি টাকার বিনিয়োগ হতো এ খাতে। সংগীতা, সাউন্ডটেক, সারগাম, সিএমভি, অনুপম, চেনা সুর, বিউটি কর্নার, সোনালি প্রডাক্টসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল এই শিল্পের চালিকা শক্তি।

সে সময়ে উৎসব মানেই ছিল নতুন অ্যালবামের প্রতিযোগিতা। দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো থাকত রঙিন পোস্টার। নতুন ক্যাসেট বা সিডির কার্টন খুলে দোকানে সাজানোর দৃশ্য ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সাংবাদিকেরা ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করতেন নতুন অ্যালবামের খবর। সংবাদপত্রের বিনোদন পাতাগুলোও সরগরম থাকত অডিও বাজারের সংবাদে। নতুন কাগজ, ছাপার কালি আর ক্যাসেটের মোড়কের মিশ্র গন্ধে অন্য এক পরিবেশ তৈরি হতো।
শনিবার সেখানে গিয়ে দেখলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। যেখানে একসময় অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অফিস ছিল, সেখানে এখন মুঠোফোন, ইলেকট্রনিক পণ্য, ঘড়ি, চার্জার ফ্যান, এলইডি লাইট কিংবা খাবারের দোকান। যে ভবনগুলোর দেয়ালে একসময় নতুন অ্যালবামের পোস্টার ঝুলত, সেগুলোর অনেকগুলোতেই এখন গানের কোনো স্মৃতিচিহ্নও নেই। বেশির ভাগ ভবন একই আছে, শুধু বদলে গেছে ভবনের নাম পরিচয়!

যে পথে হারিয়ে গেল
প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাতে শুরু করে সংগীতের বাজার। ফিতার ক্যাসেটের জায়গা নেয় সিডি। এরপর আসে এমপি থ্রি। একটি ডিস্কে শত শত গান সংরক্ষণের সুবিধা দ্রুত বদলে দেয় বাজারের চিত্র। বৈধ অ্যালবাম বিক্রি কমতে শুরু করে। এরপর ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের বিস্তার পরিস্থিতি আরও বদলে দেয়। শ্রোতারা ধীরে ধীরে সিডি কেনার অভ্যাস ছেড়ে ইউটিউব ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গান শোনায় অভ্যস্ত হন। পাইরেসি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের যুগপৎ প্রভাবে একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য ক্যাসেট ও সিডির দোকান বন্ধ হয়ে যায়। নবাবপুর ও পাটুয়াটুলী থেকেও ব্যবসা গুটিয়ে নেয় বড় বড় প্রতিষ্ঠান।

দুই হাজার সালের প্রথম দশকের শেষভাগে এসে অডিও শিল্প সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়ে। একসময় যে অ্যালবাম কয়েক লাখ কপি বিক্রি হতো, তার বিক্রি নেমে আসে কয়েক হাজারে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন অ্যালবামে বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়। কিছু প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, কেউ কেউ অন্য ব্যবসায় চলে যায়। শিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে ক্যাসেট ও সিডি উৎপাদন, প্রচ্ছদ ডিজাইন, পোস্টার ছাপা ও পরিবহন—এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষের জীবিকাও প্রভাবিত হয়।
একই সময়ে বদলে যেতে থাকে গানের প্রকাশ ও বিপণনের ধরন। আগে একটি গান শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, ডিস্ট্রিবিউটর ও দোকানের ওপর নির্ভর করতে হতো। ডিজিটাল যুগে সেই ব্যবস্থার প্রয়োজন কমে যায়। শিল্পীরা নিজেরাই ইউটিউব চ্যানেল খুলে গান প্রকাশ করতে শুরু করেন। মুঠোফোন অপারেটরদের কলার টিউন ও ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসও একসময় বিকল্প বাজার তৈরি করে। পরে ইউটিউব, ফেসবুক, স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিকসহ বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম পুরো বাজারের চেহারাই বদলে দেয়।
ফলে অডিও শিল্পের পুরোনো কাঠামো ভেঙে পড়লেও গান হারিয়ে যায়নি; বরং ক্যাসেটের দোকান থেকে সরে গিয়ে জায়গা করে নিয়েছে স্মার্টফোনের পর্দায়। একসময় যে গান কিনতে হতো, এখন সেই গান কয়েক সেকেন্ডেই পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের শ্রোতার কাছে।

পুরোনো অডিও বাজার ঘুরে এবং ডিজিটাল দুনিয়ার বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু গান থেমে নেই

ভিউয়ের বাজারে গানের নতুন হিসাব
একসময় একটি অ্যালবামে ৮ থেকে ১২টি গান থাকত। শিল্পীরা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নতুন অ্যালবাম প্রকাশ করতেন। ঈদ, পয়লা বৈশাখ কিংবা বিশেষ উপলক্ষ সামনে রেখে নতুন অ্যালবাম বাজারে আনার প্রস্তুতি চলত মাসের পর মাস। জনপ্রিয় শিল্পী ও ব্যান্ডগুলোর নতুন অ্যালবাম ঘিরে তৈরি হতো আলাদা উন্মাদনা। এখন সেই সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত। তার জায়গা নিয়েছে সিঙ্গেল গান। একটি গান, একটি ভিডিও এবং একটি ডিজিটাল রিলিজ—এটাই বর্তমান বাস্তবতা।

গানের বাজার এখন আর দোকানের বিক্রির ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে ভিউ, স্ট্রিম, শেয়ার, রিলস ও শর্ট ভিডিওর ওপর। গত দুই  দশকে ‘অপরাধী’, ‘আমি তো ভালা না’, ‘ও টুনির মা’, ‘টিকাটুলির মোড়ে একটা সিনেমা হল রয়েছে’, ‘ললনা’, ‘দয়াল তোর লাইগারে’, ‘কালাচান’–এর মতো গান দেখিয়েছে, একটি গান জনপ্রিয় হওয়ার জন্য আর অ্যালবামের প্রয়োজন হয় না। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও স্পটিফাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মই এখন গানের প্রধান বাজার। অনেক সময় কোনো গানের কয়েক সেকেন্ডের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে কয়েক দিনের মধ্যে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে শিল্পীদের প্রকাশকৌশলও। আগে একটি অ্যালবাম প্রকাশের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এখন শিল্পীরা একটি গান প্রকাশ করেই শ্রোতার প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারছেন। এতে যেমন প্রকাশের গতি বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রতিযোগিতাও। প্রতিদিন অসংখ্য নতুন গানের ভিড়ে টিকে থাকতে এখন শুধু ভালো গানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিকল্পিত প্রচারণা, আকর্ষণীয় ভিডিও নির্মাণ এবং শক্তিশালী ডিজিটাল উপস্থিতি। ফলে গান এখন শুধু শোনার নয়, দেখারও একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

নবাবপুরের এ ভবন থেকে সাউন্ডটেক ব্যবসা পরিচালনা করতেন

ব্যক্তিকেন্দ্রিক শ্রবণ অভ্যাস
গানের বাজার বদলেছে, সঙ্গে বদলেছে গান শোনার অভ্যাসও। একসময় নতুন অ্যালবাম কিনে পুরোটা শোনার একটি সংস্কৃতি ছিল। একটি অ্যালবামের গান দিনের পর দিন, মাসের পর মাস শুনতেন শ্রোতারা। কোনো কোনো অ্যালবাম বছরের পর বছর ধরে মানুষের সংগ্রহে থাকত।

অবসকিউরের ‘মাঝরাতে চাঁদ যদি’, মাইলসের ‘চাঁদতারা’, আইয়ুব বাচ্চুর ‘কষ্ট’, জেমসের ‘দুঃখিনী দুঃখ কোরো না’, আসিফ আকবরের ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’, সেলিম চৌধুরীর কণ্ঠে ‘হাছন রাজা’র গানের অ্যালবাম, হাবিব ওয়াহিদের ‘মায়া’ কিংবা আইয়ুব বাচ্চুর সুর-সংগীতে তপন চৌধুরীর প্রথম একক অ্যালবাম ‘তপন চৌধুরী’—এসব শুধু গান নয়, ছিল একটি প্রজন্মের স্মৃতি। এমন আরও অনেক অ্যালবামের নাম এ তালিকায় লেখা যায়। নতুন অ্যালবাম বের হলে অনেকেই ক্যাসেট বা সিডি কিনে বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে শুনতেন, গান লিখে রাখতেন খাতায়, সংগ্রহে রাখতেন অ্যালবামের কাভার। এখন সেই জায়গা নিয়েছে প্লেলিস্ট, অ্যালগরিদম, শর্ট ভিডিও ও অন-ডিমান্ড স্ট্রিমিং।
একটা সময় শহর থেকে গ্রাম—ঘরে ঘরে দেখা যেত টেপরেকর্ডার, ডেকসেট, টু-ইন-ওয়ান, সিডি প্লেয়ার কিংবা সাউন্ড সিস্টেম। সকালবেলা রবীন্দ্রসংগীত, দুপুরে আধুনিক গান, সন্ধ্যায় ব্যান্ডসংগীত—অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল গান। পাড়া-মহল্লার মোড়ে, চায়ের দোকানে, সেলুনে, উৎসবের প্যান্ডেলে কিংবা রিকশা-ভ্যানে পর্যন্ত বাজত জনপ্রিয় গান। ঈদে নতুন অ্যালবাম প্রকাশ হলে অনেক এলাকায় মাইক লাগিয়ে গান শোনানোরও রীতি ছিল। নতুন গানের সঙ্গে মানুষের পরিচয় হতো মূলত এভাবেই।
এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। যানজটে আটকে থাকলে গাড়িতে আর ক্যাসেট বা সিডি খোঁজার প্রয়োজন হয় না। মুঠোফোনের কয়েকটি স্পর্শেই পৌঁছে যাওয়া যায় বিশ্বের যেকোনো গানে। হেডফোন কানে দিয়ে কিংবা স্মার্টফোনের পর্দায় চোখ রেখে মানুষ এখন একান্ত ব্যক্তিগতভাবে গান শুনতে অভ্যস্ত। পরিবার বা পাড়ার সবাই মিলে একসঙ্গে গান শোনার সংস্কৃতি কমেছে, বেড়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শ্রবণ অভ্যাস।

পরিবর্তনটা শুধু মাধ্যমের নয়, শোনার অভিজ্ঞতারও। একসময় গান তৈরি হতো ঘরের সাউন্ড সিস্টেম, টেপরেকর্ডার বা মাইকের স্পিকারে শোনার কথা মাথায় রেখে। এমনও দেখা যায়, অনেক গান ও মিউজিক ভিডিওর শুরুতেই লেখা থাকে—‘সেরা অভিজ্ঞতার জন্য হেডফোন ব্যবহার করুন’ (Use Headphones...)। অর্থাৎ গান শোনার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত ডিভাইস। একসঙ্গে অনেকের শোনার বদলে একজন শ্রোতা, একজোড়া হেডফোন আর একটি স্মার্টফোন—এটাই এখন গানের নতুন বাস্তবতা। ফলে সংগীতের উপস্থাপনা, শব্দবিন্যাস এমনকি প্রযোজনার ধরনও বদলে গেছে সময়ের সঙ্গে।
শ্রোতার হাতে এখন অসংখ্য বিকল্প। ফলে একটি গান প্রকাশের পরই তাকে লড়তে হয় হাজারো গানের সঙ্গে। একসময় একটি জনপ্রিয় গান বছরের পর বছর আলোচনায় থাকত, এখন অনেক গান কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন গানের ভিড়ে হারিয়ে যায়। ফলে শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখা এখন সংগীতশিল্পীদের জন্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় চ্যালেঞ্জ।

পাটুয়াটুলীতে সংগীতার মূল বিক্রয় কেন্দ্র ছিল এ ভবনে

ভিউ থেকে বিশ্ববাজার
ডিজিটাল সংগীতের এই যুগে জনপ্রিয়তার মাপকাঠিও বদলে গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পীর সাফল্যের বড় সূচক এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম। স্পটিফাই, ইউটিউব কিংবা অ্যাপল মিউজিকে বাংলাদেশের শিল্পীদের গান নিয়মিত শুনছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের শ্রোতা। এমনও দেখা গেছে, বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের শ্রোতারাই বেশি শুনছেন তানভীর ইভানের গান। জেমস, হাবিব ওয়াহিদ, অর্ণব, তাহসান, ইমরান, প্রীতমসহ অনেক শিল্পীর গান নিয়মিত শোনা হচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও নেপালের মতো দেশগুলোতে।

প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এখন এই বাজারের বড় শক্তি। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বাংলা ভাষাভাষী শ্রোতারা নিয়মিত শুনছেন বাংলাদেশের গান। ফলে একসময় যে বাজার দেশের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন বৈশ্বিক হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব সংগীত দিবস উপলক্ষে মাছরাঙা টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান ‘সংস অব বেঙ্গল: প্রাণবন্ধের সনে’

নতুন আয়
বাংলাদেশের গান এখন ইউটিউব, ফেসবুক, স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু শ্রোতাই বাড়ছে না, বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও। কপিরাইট-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বর্তমানে দেশের বহু শিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও স্বত্বাধিকারী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে রয়্যালটি ও রেমিট্যান্স পাচ্ছেন।
একসময় নতুন অ্যালবাম বিক্রি হলে শিল্পী বা প্রযোজক আয় করতেন। শিল্পীরা প্রযোজকের কাছে যেতেন বা প্রযোজকেরা ঠিক করতেন সম্মানী, পৌঁছে দিতেন হাতে হাতে। এখন একটি গান ইউটিউব, স্পটিফাই কিংবা অন্য কোনো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে যতবার শোনা বা দেখা হচ্ছে, তার ভিত্তিতে আয় জমা হচ্ছে। সেই অর্থ সরাসরি ডলার বা অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রায় শিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও স্বত্বাধিকারীদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে যাচ্ছে। অর্থাৎ নবাবপুরের ক্যাসেটের দোকান থেকে যে ব্যবসা একসময় পরিচালিত হতো, তার একটি অংশ এখন পরিচালিত হচ্ছে বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, কয়েক ডজন শিল্পী বছরে হাজার হাজার ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছেন। জনপ্রিয় শিল্পীদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পীও ডিজিটাল স্ট্রিমিং থেকে নিয়মিত আয় করছেন। শীর্ষ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোরও ইউটিউব চ্যানেল ও ডিজিটাল ক্যাটালগ থেকে নিয়মিত ডলার আয় হচ্ছে। পুরোনো গান ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করার ফলে কয়েক দশক আগে প্রকাশিত গান থেকেও এখন আয় আসছে। একসময় যে শিল্পকে মৃতপ্রায় মনে করা হয়েছিল, সেই শিল্পই এখন ডিজিটাল রয়্যালটি, স্ট্রিমিং ও কনটেন্ট অর্থনীতির মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

নতুন ঠিকানা
নবাবপুর ও পাটুয়াটুলীর সেই জমজমাট বিক্রয়কেন্দ্র ও অফিসগুলো আর নেই। তবে ব্যবসা বন্ধও হয়নি। সংগীতা, সাউন্ডটেক, সিএমভি, চেনা সুরসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখন ছোট পরিসরে কার্যক্রম চালাচ্ছে। কেউ বিজয়নগরে, কেউ মগবাজারে, কেউ নিজস্ব ভবনের একটি ফ্লোরে অফিস পরিচালনা করছে। তাদের মূল বিনিয়োগ এখন ইউটিউব চ্যানেল, ডিজিটাল কনটেন্ট, কপিরাইট ব্যবস্থাপনা ও অনলাইন বিপণনে।
একসময়ের শীর্ষ অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সংগীতাও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। পাটুয়াটুলীর বিশাল কার্যালয় ছেড়ে এখন বিজয়নগরে ছোট পরিসরে কার্যক্রম চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সংগীতার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার ইমরান রবিন বলেন, ‘আমরা গান নিয়েই ছিলাম, গান নিয়েই আছি। পুরোনো ঐতিহ্যকে ধরে রেখেই এগোচ্ছি।’ তিনি জানান, নতুন গানে বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি তাদের পুরোনো গানের ভান্ডার ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে পাওয়া আয়ের একটি অংশ চুক্তি অনুযায়ী শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারদের রয়্যালটি হিসেবে পরিশোধ করা হচ্ছে।
তবে ডিজিটাল যুগে শুধু পুরোনো গান সংরক্ষণ নয়, নতুন গান ও মিউজিক ভিডিওতেও বিনিয়োগ করছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে গানচিল মিউজিক ও ধ্রুব মিউজিক স্টেশন নিয়মিত নতুন গান প্রকাশ করছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন লোকেশনে শুটিং করে নির্মাণ করা হচ্ছে উচ্চ বাজেটের মিউজিক ভিডিও। জনপ্রিয় শিল্পীদের নিয়ে তৈরি এসব কনটেন্টের বড় অংশই প্রকাশিত হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে। গানচিলের অন্যতম কর্ণধার, গীতিকার আসিফ ইকবাল বলেন, ‘সময় বদলেছে, শ্রোতার অভ্যাসও বদলেছে। আমরা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছি। কিন্তু গান থেকে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নতুন প্রযুক্তি ও নতুন মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে আমরা সংগীতের নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা করছি।’
নবাবপুর–পাটুয়াটুলীর গানের বাজার হয়তো আর নেই, কিন্তু তার উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে উঠেছে এক নতুন ডিজিটাল অর্থনীতি, যেখানে ব্যবসা পরিচালনের ক্ষেত্র ছোট হলেও বাজারের পরিধি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বড়।

পুরোনো পেশা, নতুন পেশা
ক্যাসেট ও সিডির যুগের অবসানের সঙ্গে হারিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি সহায়ক ব্যবসাও। ক্যাসেটের প্রচ্ছদ, অ্যালবামের পোস্টার, সিডির কাঁচামাল কিংবা অডিও প্যাকেজিংয়ের সঙ্গে যুক্ত বহু প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। ইসলামপুর, নয়াবাজার, জিন্দাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার অনেক প্রিন্টিং প্রেস, যারা একসময় অডিও শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা এখন অন্য ব্যবসায় চলে গেছে।
তবে ডিজিটাল যুগ সংগীতশিল্পে নতুন কর্মক্ষেত্রও তৈরি করেছে। একসময় এই শিল্পে মূলত শিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও প্রযোজকেরাই যুক্ত ছিলেন। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ভিডিও সম্পাদক, ডিজিটাল মার্কেটার, গ্রাফিক ডিজাইনার, ইউটিউব ম্যানেজার, কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট, কপিরাইট পরামর্শকসহ নতুন প্রজন্মের বহু কর্মী। ফলে সংগীতশিল্পের অর্থনীতি এখন অনেক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক।

কপিরাইট নিয়ে নতুন সচেতনতা
গত এক দশকে সংগীতাঙ্গনের সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর একটি হলো কপিরাইট সচেতনতা বৃদ্ধি। একসময় শিল্পীরা এককালীন অর্থের বিনিময়ে গানের স্বত্ব ছেড়ে দিতেন। এখন তাঁরা রয়্যালটি, ডিজিটাল রাইটস ও আন্তর্জাতিক ব্যবহারের বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।
কপিরাইট অফিস, আইপিআর টাস্কফোর্স ও সংগীতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে নিবন্ধিত গানের সংখ্যা বেড়েছে। এর ফলে ডিজিটাল মাধ্যম থেকে আয় সংগ্রহের পথও সহজ হয়েছে। বর্তমানে দেশের পেশাদার শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারদের অনেকে নিজেদের গান নিবন্ধন করছেন। নতুন গান প্রকাশের ক্ষেত্রেও শিল্পী, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশকদের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক কাজের প্রবণতা বেড়েছে।

হারায়নি, বদলেছে ঠিকানা
নবাবপুরের অডিও বাজার হয়তো আর ফিরবে না। পাটুয়াটুলীর দেয়ালে হয়তো আর নতুন অ্যালবামের পোস্টার দেখা যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশের গানের বাজার থেমে নেই। বিশ্ব সংগীত দিবসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের সংগীতশিল্পের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো প্রযুক্তির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে সহাবস্থান। মাধ্যম বদলেছে, ব্যবসার ধরন বদলেছে, শ্রোতার অভ্যাস বদলেছে। কিন্তু গান হারিয়ে যায়নি। কপিরাইট সচেতনতা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং বৈশ্বিক শ্রোতাভিত্তির কল্যাণে ক্যাসেটের র‍্যাক থেকে ডিজিটাল দুনিয়ায় এসে বাংলাদেশের গান খুঁজে নিয়েছে নতুন শ্রোতা, নতুন আয় ও নতুন সম্ভাবনার পথ।

Read full story at source