করিডর ঘিরে নতুন সমীকরণে ঢাকা–বেইজিং সম্পর্ক

· Prothom Alo

বাংলাদেশ ও চীন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের যৌথ ইশতেহারে বিষয়টি স্পষ্টভাবে এসেছে। দুই দেশ ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’ অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্পর্কের উত্তরণ চায়। মিয়ানমারকে যুক্ত করে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডরের ভাবনা চীন এবার আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় এনেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর সফর আয়োজনের প্রস্তুতির জন্য এবার সময় ছিল কম। তবু সফর শেষে ঘোষিত যৌথ ইশতেহার ২০২৪ ও ২০২৫ সালের যৌথ ঘোষণার তুলনায় অনেক বেশি ভবিষ্যৎ–মুখী।

Visit een-wit.pl for more information.

উল্লেখ্য, ১৯৭৫, ২০০৫ সালের পর দুই দেশের সম্পর্কে পাঁচ দশকের ইতিহাসে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হলো।

এবারের যৌথ ইশতেহারে আর্থিক সহায়তা ও প্রকল্পের মতো বিষয়গুলোর চেয়ে রাজনৈতিক পরিসরে আস্থা ও মর্যাদার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সামগ্রিকভাবে এবারের সফরে নেওয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্ত যথেষ্ট ইতিবাচক হলেও দু-একটি জায়গায় কিছু অস্পষ্টতা ও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এখন সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিকতা বজায়ের স্বার্থে বাংলাদেশকে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানচীনের প্রস্তাবিত করিডর নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। তবে এখনো কোনো অবস্থান নিইনি।

চীনের করিডরের প্রস্তাব পর্যালোচনায়

প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত চীন সফর নিয়ে গতকাল বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যোগাযোগ ও অর্থনীতির ‘ব্যাপ্তি বাড়াতে’ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব সামনে এনেছেন।

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘চীনের প্রস্তাবিত করিডর নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। তবে এখনো কোনো অবস্থান নিইনি।’

খলিলুর রহমান বলেন, চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্তি বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে কুনমিং থেকে মিয়ানমারের বন্দরগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা গেলে পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় অনেক কমে আসবে, যা বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চীন সব দেশের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখে না। এশিয়ায় থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো হাতে গোনা কয়েকটি দেশের সঙ্গে তাদের এমন অংশীদারত্ব রয়েছে। এখন বাংলাদেশও সেই তালিকায় যুক্ত হলো।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় দেশটির অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে সঙ্গে রেখেছিলেন উল্লেখ করে খলিলুর রহমান বলেন, এটি সম্পর্কের গুরুত্ব ইঙ্গিত করে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চীন সব দেশের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখে না। এশিয়ায় থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো হাতে গোনা কয়েকটি দেশের সঙ্গে তাদের এমন অংশীদারত্ব রয়েছে। এখন বাংলাদেশও সেই তালিকায় যুক্ত হলো।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে প্রথমবারের মতো দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা মিলে একটি কারিগরি সমীক্ষা করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। চীন এই প্রকল্পে যথাসাধ্য সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে।

চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের দর–কষাকষির সক্ষমতা বাড়াবে

‘এ সমস্ত প্রশ্ন করবেন না, খুব বিব্রতবোধ করি’

এ সফরে নগদ প্রাপ্তি কী হলো—একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘আপনি নগদ প্রাপ্তির কথা বললেন। ভাই, এ সমস্ত প্রশ্ন করবেন না, আমরা খুব বিব্রতবোধ করি। এখানে উনি ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যান নাই। এখানে গেছেন দুই দেশের সম্পর্কের অভিমুখ, তার কনটেন্ট এবং তার উচ্চতা, ব্যাপ্তি ও গভীরতা—এটা এস্টাবলিশ করার জন্য। বাকিগুলো পরে আসবে।’

কোনো দিন সরকারপ্রধান আরেক সরকারপ্রধানের সঙ্গে কাগজ-পেনসিল নিয়ে বসে না উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘একটু আত্মসম্মান রাখেন। আমরা অন্য জায়গায় পৌঁছে গেছি। এটা বিশ্বাস করুন। এগুলো খুব বিব্রতকর প্রশ্ন।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানআপনি নগদ প্রাপ্তির কথা বললেন। ভাই, এ সমস্ত প্রশ্ন করবেন না, আমরা খুব বিব্রতবোধ করি। এখানে উনি ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যান নাই। এখানে গেছেন দুই দেশের সম্পর্কের অভিমুখ, তার কনটেন্ট এবং তার উচ্চতা, ব্যাপ্তি ও গভীরতা—এটা এস্টাবলিশ করার জন্য। বাকিগুলো পরে আসবে।

কেমন হলো চীন সফর

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ এসেছিল ভারত থেকে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যে চিঠি পাঠান, তাতে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ ছিল। আমন্ত্রণ ছিল মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছ থেকেও। এরপর চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়েরও আমন্ত্রণপত্র আসে বেইজিং সফরের জন্য। শেষ পর্যন্ত ভারত কিংবা চীনের পরিবর্তে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেন তারেক রহমান। গত সপ্তাহে মালয়েশিয়া ঘুরে চীন যান তিনি।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে ভারতের বেশ কিছু গণমাধ্যম দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি ‘তাৎপর্যপূর্ণ মোড়’ হিসেবে অভিহিত করেছে। দেশটির প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলোয় মোংলা বন্দরের অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা, সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সম্পর্কে অগ্রাধিকার

গত দুই বছর, অর্থাৎ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর প্রচারিত যৌথ ঘোষণা এবং এবারের সফরের পর প্রচারিত যৌথ ইশতেহার সম্পর্কে ঢাকা ও বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সূত্র এবং বিশ্লেষকদের কাছে জানতে চান এই প্রতিবেদক। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে এবং তিনটি সফরের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এবার ১৪টি ধারাবিশিষ্ট যে যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে, তার পর্যায়ক্রম ও উপস্থাপনা এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চীন অতীতের তুলনায় নিজেদের দাবির ক্ষেত্রে যথেষ্ট নমনীয় ছিল। বাংলাদেশকে নিজেদের প্রভাববলয়ে রাখতে চীন সচেষ্ট ছিল বলে পর্যবেক্ষকদের মত।

সম্পর্কের উত্তরণের বিষয়ে সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য এগিয়ে নিতে চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য ৯৮ শতাংশের পরিবর্তে ১০০ শতাংশ শুল্কছাড়কে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশও রাজনৈতিক পরিসরে যুক্ততায় বেশি মনোযোগ দিয়েছে। ভবিষ্যৎ–মুখী হওয়াকে সমীচীন ভেবে নিয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক পরিসরে সম্পর্কটি যে মর্যাদা আর আস্থার, সেটি প্রতিফলিত হয়েছে যৌথ ইশতেহারে।

সম্পর্কের উত্তরণের বিষয়ে সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য এগিয়ে নিতে চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য ৯৮ শতাংশের পরিবর্তে ১০০ শতাংশ শুল্কছাড়কে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে এবারের সফরের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ইতিবাচক এবং ভবিষ্যৎ–মুখী হলেও কয়েকটি জায়গায় অস্পষ্টতা ও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। যেমন বাংলাদেশ চীনের চার বৈশ্বিক উদ্যোগে সমর্থনের কথা জানিয়েছে। বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ বা জিডিআইয়ে যুক্ত হতে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এটি স্পষ্ট হলেও অন্য তিন উদ্যোগ বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ বা জিএসআই, বৈশ্বিক সভ্যতা উদ্যোগ বা জিসিআই এবং বৈশ্বিক সুশাসন উদ্যোগ বা জিজিআইয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ কী আলোচনা করেছে, সেটা স্পষ্ট করা হয়নি। যখন এক দেশ অন্য দেশের উদ্যোগকে সমর্থন করে, তাতে এমন ইঙ্গিত দেয় যে ওই উদ্যোগগুলোয় যুক্ততার অভিপ্রায় রয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের পর ঘোষণায় বাংলাদেশ কখনো চীনের পুনরেকত্রীকরণের প্রতি জোরালো সমর্থনের কথা বলেনি। এবারই বাংলাদেশ এটি বলেছে। ফলে এটি বাংলাদেশের সঙ্গে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধুদের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

জেনেভায় জাতিসংঘের দপ্তরে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মোহাম্মদ সুফিউর রহমানের মতে, তুলনামূলকভাবে স্বল্পতম সময়ের প্রস্তুতিতে আয়োজিত প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এতে অনেকগুলো ভবিষ্যৎ–মুখী সিদ্ধান্ত যেমন নেওয়া হয়েছে, তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। বাংলাদেশের মূল কাজটা শুরু হলো সফর শেষ হওয়ার পর। তাই রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে যে কাজগুলো আগে হয়নি, সেগুলোসহ পরিকল্পিতভাবে সিদ্ধান্ত এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জটা বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হবে।

Read full story at source