স্কালোনি–দে লা ফুয়েন্তে: বিশ্বকাপ ফাইনালে গুরু-শিষ্যের অন্য লড়াই

· Prothom Alo

২০১৭ সালের নভেম্বর। মাদ্রিদের উপকণ্ঠে লাস রোজাসের ‘সিউদাদ দেল ফুটবল’–এ চলছে এক কোচিং কোর্সের ক্লাস। ক্লাসরুমে আছেন সদ্য বুট তুলে রাখা কয়েকজন সাবেক ফুটবলার; যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাভিয়ের সাভিওলা, ফের্নান্দো রেদোন্দো। সামনের সারিতে বসা একজন আর্জেন্টাইন সেখানে প্রশ্ন করছেন অনবরত, তর্ক জুড়ে দিচ্ছেন শিক্ষকের সঙ্গে।

Visit playerbros.org for more information.

সেই ছাত্রের নাম কি জানেন? লিওনেল স্কালোনি। আর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে, ধৈর্য নিয়ে অনুসন্ধিৎসু ছাত্রের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন যিনি, তাঁর নামটা লুইস দে লা ফুয়েন্তে।

৯ বছর পর আজ সেই শিক্ষক আর সেই ছাত্র আবার মুখোমুখি—তবে এবার ক্লাসরুমে নয়, বিশ্বকাপ ফাইনালের ডাগআউটে। এমন গল্প তো লেখা হয় সিনেমাতেই!

২০১৭ সালের সেই দিনগুলোতে ফিরে গেছেন দে লা ফুয়েন্তে। তাঁর ভাষায়, পৃথিবীর যেকোনো স্কুলের ক্লাসরুমের মতোই লাস রোজাসেও ছিল নির্দিষ্ট বিন্যাস—কেউ সামনে বসে মনোযোগী, আবার ব্যাকবেঞ্চাররা পেছনে বসে করে উসখুস।

স্কালোনি বসতেন ক্লাসের সবচেয়ে মনোযোগী ছাত্রের মতো সামনের বেঞ্চে। শুধু শুনতেনই না; কোচের প্রতিটি কথায় প্রশ্ন তুলতেন, বিতর্কে জড়াতেন। দে লা ফুয়েন্তের ভাষায়, তখনই বোঝা গিয়েছিল এই ছেলেটার মধ্যে ‘অন্য রকম কিছু’ আছে।

সেই কোর্সের আরেকজন ছাত্র ছিলেন সাবেক অ্যাথলেটিক বিলবাও ফুটবলার পাবলো ওরবাইজ। দে লা ফুয়েন্তের ক্লাসের নোটগুলো এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, স্কালোনি আর দে লা ফুয়েন্তের প্রাণবন্ত আলাপচারিতা তাঁরা সবাই উপভোগ করতেন।

স্পেন কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তে

কার্লোস গুরপেগি নামের আরেক সহপাঠীর ভাষ্যে, সেই ক্লাসে যে তিন-চারজনের মধ্যে বড় কোচ হওয়ার তাড়না ছিল, স্কালোনি ছিলেন তাঁদের একজন। ক্লাসের পর মাঠে নেমে প্রীতি ম্যাচও খেলতেন তাঁরা। সেখানেও স্কালোনির প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

দে লা ফুয়েন্তে তখন ছিলেন স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচ। এর আগে জিতেছেন ২০১৫ সালের উয়েফা অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরো—যে দলে ছিলেন আজকের রদ্রি, মিকেল মেরিনো, উনাই সিমনরা। আর স্কালোনি তখন হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে কাজ করছেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে। তার আগে সেভিয়ার সহকারী কোচ ছিলেন—যে ক্লাবে দে লা ফুয়েন্তে শুধু খেলেনইনি, একটা সময় তাদের যুব দলের কোচও ছিলেন।

বিশ্বকাপ ফাইনাল: অলৌকিক আর্জেন্টিনা, না সম্মোহনী স্পেন

বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে দে লা ফুয়েন্তেকে সেই কোচিং ক্লাসের স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়া হলে তিনি শিষ্যকে ভাসিয়েছেন প্রশংসায়, ‘এখন হয়তো বলা সহজ যে স্কালোনি অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল, কিন্তু সত্যিই তার মধ্যে বিশেষ কিছু ছিল। ওর ছিল অদম্য কৌতূহল, প্রশ্ন করার সাহস। সে বলত, ‘আমি বিষয়টা এভাবে দেখি না।’ সে সব সময় আলোচনা করত, তর্ক করত।’

স্কালোনিও ফাইনালের আগে ‘গুরুর’ অবদানের কথা ভোলেননি, ‘আমাদের মতো যারা লাস রোজাসে কোচিং কোর্স করেছিলাম, লুইস তাদের নানাভাবে সাহায্য করেছেন। তাঁর সঙ্গে আমার অনেকবার কথা হয়েছে।’

আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি ও কোচ লিওনেল স্কালোনি

এক দিক দিয়ে অবশ্য স্কালোনি দে লা ফুয়েন্তের সিনিয়রই। ২০২১ সালে স্কালোনি যখন আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের প্রথম শিরোপা কোপা আমেরিকা জেতেন, তখনো দে লা ফুয়েন্তে স্পেনের অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কোচ। এরপর স্কালোনি জিতেছেন বিশ্বকাপ, তারপর আবার কোপা।

ওদিকে দে লা ফুয়েন্তে স্পেনকে দুই বছর আগেই জিতিয়েছেন ইউরো। শিষ্য যখন গুরুর চেয়েও এগিয়ে যান, তখন সেই ভালো লাগাটা যে অন্য রকম হয়, স্কালোনিকে নিয়ে কথা বলার সময় দে লা ফুয়েন্তেও তা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।

বিশ্বকাপ ফাইনাল: অলৌকিক আর্জেন্টিনা, না সম্মোহনী স্পেন

শুধু কোচ নন, মানুষ হিসেবেও স্কালোনি দে লা ফুয়েন্তের প্রিয়দের একজন, ‘ফুটবলের বাইরে জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, মানুষকে সামলানোর ধরন—সব ক্ষেত্রে ওর (স্কালোনি) সঙ্গে আমার অনেক মিল। সাফল্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের সঙ্গে সম্পর্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একই মূল্যবোধে বিশ্বাস করি।’ স্কালোনিই যেমন বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, দে লা ফুয়েন্তে কত অসাধারণ একজন মানুষ।

ফাইনালের আগে স্কালোনি রসিকতা করে বলেছেন, দে লা ফুয়েন্তেকে তাঁর ফোন দেওয়ার কথা থাকলেও ফাইনালে প্রতিপক্ষ হয়ে যাওয়ায় সেটা আপাতত স্থগিত আছে। তবে ম্যাচটা যিনিই হেরে যান না কেন, অন্যজনের কাছ থেকে ফোন কলটা পেতে তাঁর দেরি হওয়ার কথা নয়!

ফাইনালের আগেই পিছিয়ে নেই তো আর্জেন্টিনা

Read full story at source