‘টেস্টোস্টেরন স্ক্রিনিংয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ কি হেগসেথের হাতে নেই’

· Prothom Alo

পিট হেগসেথ হয়তো কোনো একদিন ভালো কোনো কাজের জন্য খবরের শিরোনাম হবেন। এমন কোনো কাজ, যা নিয়ে তাঁর মা গর্ব করতে পারবেন।

Visit newssport.cv for more information.

হয়তো কোনো একদিন আমরা প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে এমন কোনো শিরোনাম দেখব, যেখানে কোনো নেতিবাচক খবর থাকবে না। যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণ বা ধর্মান্ধতার কোনো অভিযোগ থাকবে না। এমনকি কর্মক্ষেত্রে মদ্যপান, সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ, খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদ কিংবা পুরুষদের দাড়ি-গোঁফ নিয়ে তাঁর অদ্ভুত মোহের কথাও থাকবে না।

কিন্তু হায়! সেই দিন এখনো আসেনি। বরং আজ আমরা তাঁকে নিয়ে আলোচনা করছি ভিন্ন এক কারণে। কারণ, হেগসেথ এখন টেস্টোস্টেরন নিয়ে খুব মেতে আছেন। গত বুধবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী ‘যোদ্ধাদের’ জন্য নতুন একটি স্ক্রিনিং কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, সেনাদের শরীরে ‘সঠিক মাত্রায় টেস্টোস্টেরন’ আছে কি না, তা নিশ্চিত করা।

এক্সে পোস্ট করা একটি ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘দ্য হাই-টি ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’। সেখানে হেগসেথ ব্যাখ্যা করেন, ‘শুরুতেই স্বাস্থ্যের এসব সূচক ঠিক করার মাধ্যমে আমরা আপনাদের যুদ্ধসক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে রাখছি।’ কিন্তু এখানে ‘আপনারা’ বলতে ঠিক কাদের বোঝানো হয়েছে? এই নীতি কি নারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য?

ভিডিওতে স্পষ্ট করা হয়নি বিষয়টি। তবে নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে নারীদেরও টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা করা হবে। এই নতুন নীতির বিস্তারিত দিকগুলো এখনো অস্পষ্ট। সেনাবাহিনীতে নারীদের উপস্থিতির বিষয়ে হেগসেথের স্পষ্ট অনীহা রয়েছে। তাই তিনি যদি তাঁর তথাকথিত ‘হাই-টি ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ থেকে নারীদের তাড়ানোর অজুহাত হিসেবে ‘কম টেস্টোস্টেরন’-এর বিষয়টিকে ব্যবহার করেন, তাহলে আমি মোটেও অবাক হব না।

৩০ বছরের বেশি বয়সী সেনাদের টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করছে যুক্তরাষ্ট্র

আগে হেগসেথ সরাসরি যুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণের তীব্র বিরোধিতা করতেন। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার সময় তিনি এ অবস্থান থেকে সরে আসেন। সম্ভবত তাঁর মনোনয়নের পক্ষে থাকা সিনেটরদের চাপেই তিনি এমনটা করেছিলেন।

এরপরও নারী ও সংখ্যালঘুদের পদোন্নতির বিষয়ে হেগসেথ এখনো বিরোধী অবস্থানেই আছেন বলে মনে হচ্ছে। সম্প্রতি তিনি নৌবাহিনীর সাতজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ‘টু-স্টার অ্যাডমিরাল’ পদে পদোন্নতি আটকে দিয়েছেন। এই সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই নারী অথবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের (শ্বেতাঙ্গ নন এমন)।

এ বিষয়ে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, অত্যন্ত অস্বাভাবিক এ পদক্ষেপের মানে হলো, এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এ বছরই প্রথম নৌবাহিনীর সক্রিয় দায়িত্বে থাকা কোনো নারী কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন না।

এখন প্রশ্ন হলো, যদি কোনো সেনাসদস্যের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা হেগসেথের কাছে পর্যাপ্ত মনে না হয়, তাহলে কী হবে? আবারও বলছি, এর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে নিজের ওই ছোট ভিডিওতে হেগসেথ জানিয়েছেন, কেউ চাইলে ‘টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি’র সুবিধা দেবে সরকার।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ

নারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদিত কোনো টেস্টোস্টেরন চিকিৎসা নেই। তাই ধরে নেওয়া যায় যে এ চিকিৎসা শুধু পুরুষদের জন্যই হবে। অনেকেই একে ‘জেন্ডার-অ্যাফার্মিং কেয়ার’ বা ‘লিঙ্গ রূপান্তরকামী চিকিৎসা’ও বলতে পারেন। অতীতে ট্রাম্প প্রশাসন সেনাসদস্যদের হরমোনের পেছনে অর্থ ব্যয় করার বিষয়ে বেশ সতর্ক ছিল।

প্রেসিডেন্ট সেনাবাহিনী থেকে ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের নিষিদ্ধ করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর অন্যতম একটি যুক্তি হলো, সেনাদের জন্য জেন্ডার-অ্যাফার্মিং চিকিৎসার পেছনে অনেক বেশি খরচ হয়।

হেগসেথের নতুন এ টেস্টোস্টেরন নীতিতে কত টাকা খরচ হবে, তা এখনো অস্পষ্ট। তবে আমি নিশ্চিত যে এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান তাঁরা অনায়াসই পেয়ে যাবেন।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রূপান্তরকামী সেনাদের স্বাস্থ্যসেবায় যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, তার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি অর্থ খরচ করে ভায়াগ্রা ও লিঙ্গোত্থানজনিত সমস্যার অন্যান্য ওষুধের পেছনে। তার মানে, বিশেষ একধরনের ‘জেন্ডার-অ্যাফার্মিং কেয়ার’-এর জন্য তাদের কাছে সব সময়ই অর্থ থাকে।

মার্কিন সেনাদের টেস্টোস্টেরন পরীক্ষার পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন চিকিৎসকদের

আর যুদ্ধের জন্য তো সব সময়ই অর্থের ছড়াছড়ি। যেকোনো সময়ই হেগসেথের এ টেস্টোস্টেরন-স্ক্রিনিংয়ের ঘোষণা ভ্রু কুঁচকানোর মতো একটি বিষয় হতো। কিন্তু ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির তীব্রতার মধ্যে এ ঘোষণা বিশেষভাবে হাস্যকর ঠেকছে।

যেদিন হেগসেথ এ টেস্টোস্টেরন নীতির ঘোষণা দিলেন, ঠিক সেদিনই ইরান মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধের হুমকি দেয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করেছে। পাশাপাশি ট্রাম্পও দেশটিতে হামলা বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

এই অপ্রয়োজনীয় ও বেআইনি যুদ্ধের কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না। এর পেছনে এরই মধ্যে শত শত কোটি ডলার খরচ হয়ে গেছে। এ যুদ্ধ সবার জীবনকেই আরও ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক করে তুলছে। টেস্টোস্টেরন স্ক্রিনিং নীতির চেয়ে হেগসেথের হাতে কি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ নেই?

অবশ্যই হেগসেথের হাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। তবে তিনি সেসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ ঠিকঠাক করতে সক্ষম কি না, তা পুরোপুরি ভিন্ন একটি বিষয়।

হেগসেথ নিজের ও তাঁর সেনাদের শরীরে ইচ্ছেমতো যত খুশি হরমোন পুশ করতে পারেন। কিন্তু ফক্স নিউজের এই সাবেক উপস্থাপককে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদের যোগ্য করে তুলতে পারে, এমন কিছুই আসলে নেই।

আমার মনে হয় হেগসেথ হয়তো ধীরে ধীরে বুঝতে পারছেন যে ভূরাজনীতি বেশ কঠিন একটা বিষয়। সামরিক কৌশল ও কূটনীতিও যথেষ্ট কঠিন। এর চেয়ে দাড়িওয়ালাদের নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করা অনেক সহজ। হরমোন স্ক্রিনিংয়ের ভিডিও বানিয়ে টেস্টোস্টেরন-পাগল পুরুষতান্ত্রিক ভক্তদের তোষামোদ করাটাও সোজা। সেনাদের টেস্টোস্টেরন পরীক্ষার কথা ভুলে যান, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নিজেরই প্রাথমিক যোগ্যতাটুকু আছে কি না, যুক্তরাষ্ট্রের এখন সেটাই পরীক্ষা করে দেখা উচিত।

  • আরওয়া মাহদাউই, কলামিস্ট, দি গার্ডিয়ান

Read full story at source