ব্যাংকঋণের সুদের হারে লাগাম টানতে কমল নীতি সুদহার
· Prothom Alo

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য নীতি সুদহার বা রেপো রেট কমিয়েছে। ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে নীতি সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে।
এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় কম সুদে অর্থ ধার নিতে পারবে। এতে গ্রাহক পর্যায়েও ঋণের সুদহার কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দীর্ঘ ২১ মাস পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
Visit catcross.org for more information.
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ১৩তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। নতুন নীতি সুদহার আগামী ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, দেশীয় বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কী প্রভাব পড়তে পারে
নীতি সুদহার কমানোর মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুসারে, ১৪ বছরের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে সবচেয়ে কম বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে বিদায়ী অর্থবছরে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্ষমতার পটপরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা কারণে চার-পাঁচ বছর ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি আছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। এসব কারণে উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে আগ্রহ কম। তাঁরা ঋণের সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
নীতি সুদহার কমানোর ফলে ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুদের হার কমানোর সুযোগ পাবে। এতে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে। যা ব্যবসাবাণিজ্য বাড়াতে সহায়ক হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। যা সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কাজে লাগবে। উল্লেখ্য, বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৪ শতাংশের ঘরে নেমেছে।
অন্যদিকে গত কয়েক বছর ধরে কর্মসংস্থানও স্থবির হয়ে পড়েছে। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি তিনজন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে একজন বেকার। দেশে এখন এমন প্রায় ৯ লাখ বেকার আছে। এই সংখ্যা ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে উল্লেখিত শিক্ষিত বেকারের সংখ্যার দ্বিগুণ। এই শিক্ষিত তরুণগোষ্ঠী পছন্দসই কাজ পাচ্ছে না। নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
নতুন গভর্নরের উদ্যোগ
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ১১ দফা নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছিল। এরপর অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় ধরে এ হার অপরিবর্তিত রাখা হয়। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি কমেনি।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নীতি সুদহার দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত রাখা হয়। কিন্তু এখন মূল্যস্ফীতি সেই সময়ের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে এখনো বেশির ভাগ জিনিসের দাম চড়া। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি।
নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান যোগ দিয়েই নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেন। তবে সেই সময় ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সেখান থেকে সরে আসেন তিনি। এরপর গত ৩০ জুন চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে সুদহার না কমানোর যুক্তি হিসেবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির গতি ধারা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নীতি সুদহার কমানোর পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) রেট ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। তবে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) রেট ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
এমপিসির সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কামাল মুজেরী, বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আখতার হোসেন, নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদ উপস্থিত ছিলেন।