ক্ষয়ে যাওয়া স্মৃতিতে আব্দুল মুতালিব
· Prothom Alo

সাদা চাদরে গা জড়িয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন তিরাশি বছরের রাহেলা বেগম। তাঁর গোল গোল শীতল চোখ দুটো অপলক তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। পাশেই চেয়ার টেনে বসে আছে মেয়ে রানু। রাহেলা বেগম কিছুক্ষণ পরপর মেয়ের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছেন, আর রানু চোখ সরালেই চাদরটা টেনেটুনে আরও শক্ত করে গায়ে জড়াচ্ছেন। যেন একটা গোপন খেলা চলছে মা-মেয়ের মধ্যে। এই লুকোচুরি চলছে বেশ কিছুক্ষণ ধরে।
রানু মায়ের কপালে আলতো করে হাত রেখে নরম গলায় ডাকল, ‘আম্মা?’
Visit michezonews.co.za for more information.
রাহেলা বেগম চোখ পিটপিট করে তাকালেন।
‘তুমি ঘুমাচ্ছ না কেন?’
রাহেলা বেগম যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন। বিড়বিড় করে বললেন, ‘খিদা লাগছে রে মা। সারা দিন এই বেটারা আমারে কিচ্ছু খাইতে দেয় নাই। পেটের ভেতর চোঁ চোঁ করতাছে।’
রানু হাসল, কিন্তু তার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। বলল, ‘আম্মা, আমি তো মাত্র নিজ হাতে তোমাকে খাইয়ে দিলাম। তোমার পেট ভরা। এখন লক্ষ্মী মায়ের মতো ঘুমাও।’
রাহেলা বেগম যেন আশ্বস্ত হতে পারলেন না। মেয়ের হাতটা খপ করে ধরে কাতর স্বরে বললেন, ‘তুমি কই যাবা? থাকবা তো এইখানে? আমার একা লাগতাছে।’
‘আমি কোথাও যাব না। তোমার পাশেই বসে আছি।’
রাহেলা বেগম এবার এদিক-ওদিক তাকালেন, যেন কোনো গোপন কথা বলার চেষ্টা করছেন।
‘শোনো মা, মুতালিবরে একটা কল করতে হইবো। হের শরীরটা নাকি খুব ভালো না। কিছু ট্যাকা পাঠাইতে হইবো। পোলাটার খোঁজখবর কেউ লয় না।’
রানু একটু থমকে গেল। বুকটা ধক করে উঠল তার। তারপর চট করে সামলে নিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, পাঠাবো। তুমি ঘুমাও।’
আব্দুল মুতালিব রাহেলা বেগমের একমাত্র ছোট ভাই। বয়স আশির কাছাকাছি হতেই মারা যান বছরখানেক আগে। রাহেলা বেগম সারা জীবন এই ভাইকে আগলে রেখেছেন। রানু যখন আমেরিকার কষ্টার্জিত ডলার থেকে নিয়মিত টাকা পাঠাত, রাহেলা বেগম সেই টাকার কিছুটা তুলে রাখতেন ভাই মুতালিবের জন্য। মুতালিব যে আর নেই, এই পরম সত্যটা রাহেলা বেগমের মগজ স্বীকার করতে চায় না। স্মৃতির পাতা ওলট–পালট করে তিনি বারবার অতীতে ফিরে যান।
মিনেসোটার রচেস্টারের মায়ো ক্লিনিকে রাহেলা বেগমকে ভর্তি করা হয়েছে গত সপ্তাহে। ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে তিনি নিউমোনিয়া বাঁধিয়েছেন। বয়সে জরাজীর্ণ শরীর এই ধকল সইতে পারবে কি না, তা নিয়ে ডাক্তারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। বাঁ হাতে আইভি লাগানো। কয়েক ঘণ্টা পরপর নার্সরা এসে শিরায় তরল ওষুধ আর ভিটামিন দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাহেলা বেগমের এই সুই-সুতার কারবার একেবারেই নাপছন্দ। সুযোগ পেলেই তিনি আইভি লাইনটা টেনে খুলে ফেলার চেষ্টা করেন।
রানু সপ্তাহে পাঁচ দিন চাকরি করে। রায়ানের ডিউটি সপ্তাহে ছয় দিন। তাই রাহেলা বেগমকে দেখভালের জন্য একজন ‘হোম এইড’ রাখা হয়েছে। ভদ্রমহিলা বেশ অমায়িক। রাহেলা বেগমকে পার্কে নিয়ে বেড়ানো, গল্প করা, বই পড়ে শোনানো—সবই করেন। তবে মাঝেমধ্যে রাহেলা বেগম অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটান।
গতকালও এই কাণ্ড করতে গিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়েছিল। শ্বেতাঙ্গ নার্স এসে হুলুস্থুল কাণ্ড বাধিয়ে রক্ত পরিষ্কার করে আবার নতুন করে সুই ফোটালেন।
ভর্তির প্রথম দিন দোভাষী নিয়ে এসে ডাক্তার থমাস যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কীভাবে নিউমোনিয়া বাধালেন?’
রাহেলা বেগম তখন বিছানায় উঠে বসে হড়হড় করে বলেছিলেন, ‘আমি তো ইচ্ছা কইরা বৃষ্টিতে ভিজি নাই। আমারে তো মুন্নি কইলো—নানি, বৃষ্টি নামছে, চলো বৃষ্টিতে গোসল করি। নাতনি শখ করে কইছে, না করন যায়?’
ডাক্তার থমাস অবাক হয়ে আড়চোখে তাকালেন রানুর দিকে। রানু ইশারায় ডাক্তারকে কেবিনের বাইরে নিয়ে এসে আসল ঘটনা খুলে বলতেই থমাস মৃদু হেসে বললেন, ‘আই নো মিসেস রানু! এটা আলঝেইমার্সের খুব কমন সিম্পটম। কাল্পনিক গল্প তৈরি করা। চিন্তা করবেন না, আমি বুঝতে পারছি।’
রানু চিন্তিত মুখে বলল, ‘কিন্তু দিন দিন তাঁর এই সমস্যাগুলো বাড়ছে, ডক্টর।’
‘ওষুধগুলো চালিয়ে যান আর সাবধানে রাখুন। ওনাকে কোনোভাবেই বাড়িতে একা রাখা যাবে না।’
মাকে নিয়ে রানুর দুশ্চিন্তার শেষ নেই। সেদিন ছিল তার সপ্তাহের ছুটির দিন, তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল। ঘরের সব কাজ সামলে বিছানায় গিয়ে কাত হতেই কখন যে চোখ লেগে গেল, টেরই পায়নি। আর ঠিক তখনই দুর্ঘটনাটা ঘটল।
ঘণ্টাখানেক পর মুন্নি এসে চিৎকার করে রানুকে ডেকে তুলল, ‘মা! মা! দেখো, নানু বাড়ির সামনের লনে বৃষ্টিতে ভিজছে!’
রানু ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে বাইরে দৌড়ে গেল। গিয়ে দেখে, রাহেলা বেগম দুই হাত মেলে মুক্ত পাখির মতো উঠানে দাঁড়িয়ে আছেন। আকাশ থেকে অবিরাম বৃষ্টির ধারা তাঁর রুপালি চুলে আছড়ে পড়ছে, আর তিনি শিশুর মতো খিলখিল করে হাসছেন। যেন তিরাশি বছরের এক বৃদ্ধা নিমেষেই আট বছরের এক বালিকা হয়ে গেছেন। সেই রাতেই শুরু হলো ধুম জ্বর আর শ্বাসকষ্ট।
রানু সপ্তাহে পাঁচ দিন চাকরি করে। রায়ানের ডিউটি সপ্তাহে ছয় দিন। তাই রাহেলা বেগমকে দেখভালের জন্য একজন ‘হোম এইড’ রাখা হয়েছে। ভদ্রমহিলা বেশ অমায়িক। রাহেলা বেগমকে পার্কে নিয়ে বেড়ানো, গল্প করা, বই পড়ে শোনানো—সবই করেন। তবে মাঝেমধ্যে রাহেলা বেগম অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটান।
গত মাসের ঘটনা। রানু অফিস থেকে ফিরে দেখে হোম এইড মহিলা লিভিং রুমে মুখ কালো করে বসে আছে। রানু জিজ্ঞেস করল, ‘সব ঠিক আছে তো?’
রাহুল—রাহেলা বেগমের বুকের মানিক। তাঁর বেঁচে থাকার প্রধান খুঁটি ছিল যে ছেলে, সে একদিন নিজের সংসার আর ব্যস্ততার অজুহাতে মাকে পর করে দিল। সেই সংসারে রাহেলা বেগমের ঠাঁই হলো না। আজ এই দূর পরবাসে, শীতল চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে রাহেলা বেগম কি তবে সেই অবাধ্য ছেলের স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন?
মহিলা হুট করে কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘আন্টি তাঁর তজবি খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তাই আমার হাত চেপে ধরে বললেন—সত্যি কথা কও! তুমি কি তজবিটা চুরি করছ? বলেন তো, আমি কি চোর?’
রানু সেদিন অনেক বুঝিয়ে-শুঝিয়ে তাঁকে শান্ত করেছিল। অথচ পরে রাহেলা বেগমকে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই তিনি আকাশ থেকে পড়লেন। চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘কী কও এসব! আমি কবে তারে চোর কইছি? হের মতো ভালো মানুষ দুনিয়ায় আছে? ছি ছি!’
রাহেলা বেগমের এই নিষ্পাপ বিস্ময়ের সামনে রানু আর কথা বাড়াতে পারে না। একসময়ের অসম্ভব গোছানো, পরিপাটি সাংসারিক মানুষটা আজ স্মৃতির খরায় ভুগছেন। রান্নাঘরে গিয়ে হা করে দাঁড়িয়ে থাকেন, মনে করতে পারেন না নিজের শোবার ঘর কোনটা। মাঝেমধ্যে গভীর রাতে রানুর ঘুম ভেঙে যায়। সে দেখে, মা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গুনগুন করে পুরোনো দিনের কোনো গান গাইছেন।
কখনো চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন আকাশের চাঁদের দিকে। কী যেন ভাবেন! ফেলে আসা সেই দিন? নাকি বিদায়ের সানাই শুনতে পেয়ে বিষণ্ণতায় ডুবে যান তিনি? রানু এসব ভেবে কোনো কূলকিনারা পায় না।
২.
আজ নয় দিন হলো রাহেলা বেগম হাসপাতালে। বিকেলের সূর্যটা মায়ো ক্লিনিকের কাচের জানালা গলে অস্ত যাচ্ছে। জানালার পাশের আর্মচেয়ারে রাহেলা বেগমকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি স্থবির হয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। ঘরজুড়ে গোধূলি আলোর সোনালি আভা এসে পড়েছে তাঁর রুপালি চুলে। দেখতে অবিকল কোনো জীবন্ত তৈলচিত্রের মতো লাগে।
রানু কফির কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। কী ভাবছেন তিনি? সেই ফেলে আসা ধূসর যৌবনের কথা, নাকি মনে করার চেষ্টা করছেন পুরোনো ফটো অ্যালবামে ধারণ করা একমাত্র ছেলেটির কথা? সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নস্টালজিয়া আর বিষণ্ণতার ঢেউ কি তবে তার ওপর আছড়ে পড়েছে?
রাহুল—রাহেলা বেগমের বুকের মানিক। তাঁর বেঁচে থাকার প্রধান খুঁটি ছিল যে ছেলে, সে একদিন নিজের সংসার আর ব্যস্ততার অজুহাতে মাকে পর করে দিল। সেই সংসারে রাহেলা বেগমের ঠাঁই হলো না। আজ এই দূর পরবাসে, শীতল চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে রাহেলা বেগম কি তবে সেই অবাধ্য ছেলের স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন?
বাইরে মিনেসোটার বুকে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘরের সোনালি আলোটা ধীরে ধীরে আবছা অন্ধকারে রূপ নিচ্ছে, আর সেই অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে এক মায়ের ক্ষয়ে যাওয়া স্মৃতির অবশিষ্ট কণা। বেঁচে থাকল শুধু এক অদ্ভুত মায়া, যা মৃত্যু বা স্মৃতিভ্রম—কোনো কিছু দিয়েই মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
এই তো কয়েক মাস আগেও রাহেলা বেগম ছেলের সঙ্গে তোলা ছবিগুলো জরাজীর্ণ হাতে নিয়ে কাঁদতেন। ছবির রাহুলকে ছুঁয়ে কথা বলতেন। কাগজে বন্দী সেই হিমায়িত মুহূর্তগুলো, ছেলের দুষ্টুমি মাখা হাসির ছবি দেখে দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়তেন, আর গাল বেয়ে অবাধে অশ্রু ঝরত। তারপর চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করতে করতে ছেলের সুখের জন্য প্রার্থনা করতেন।
অথচ অদ্ভুত ব্যাপার, গত মাস দুয়েক যাবৎ তিনি ছেলের নাম মুখেও আনেন না। তবে কি তীব্র অভিমানে তিনি ছেলেকে মন থেকে মুছে ফেলেছেন! নাকি বয়সের রাক্ষুসে থাবা তাঁর স্মৃতি থেকে ছেলের অস্তিত্বটাই পুরোপুরি গিলে ফেলেছে?
রানু কফির কাপটা টেবিলে রেখে মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল। রাহেলা বেগম ধীরে ধীরে মুখ ফেরালেন।
‘রানু! একটা কথা কইতাম।’
‘বলো আম্মা, শুনছি।’
রাহেলা বেগম রানুর হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিলেন। তাঁর চোখজোড়া ছলছল করে উঠল। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘আমি যদি মইরা যাই, মুতালিবরে তুমি একটু দেইখো মা। আমি ছাড়া হের এই দুনিয়ায় কেউ নাই। আমাগো তো বাপ আছিল না। মামার বাড়িতে কত লাথি-উষ্ঠা খাইয়া দুই ভাই-বোন বড় হইছি। আমার কপাল ভালো আছিল, রূপ আছিল, তাই তোমার আব্বা আমারে বিয়া কইরা সুন্দর একটা জীবন দিছিল। কিন্তু মুতালিবের কপালটা পোড়া। হের আমি ছাড়া আপন কেউ নাই মা। তোমার কাছে আমার এই একটাই দাবি, তুমি ওরে ফালাইয়া দিও না।’ কথাটা শেষ করেই রাহেলা বেগম বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
রানু বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে মায়ের মুখের দিকে। রাহেলা বেগম বুক ভাসিয়ে কাঁদছেন আদরের ছোট ভাই আব্দুল মুতালিবের জন্য, যিনি ইতিমধ্যে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। অথচ এই পরম মুহূর্তটিতে তাঁর নিজের জন্ম দেওয়া, জীবিত ছেলের কথা মগজের কোনো কোনায় উঁকিও দিল না।
রানুর বুকের ভেতরটা তীব্র মুচড়ে উঠল। সে সজোরে মাকে জড়িয়ে ধরল।
বাইরে মিনেসোটার বুকে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘরের সোনালি আলোটা ধীরে ধীরে আবছা অন্ধকারে রূপ নিচ্ছে, আর সেই অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে এক মায়ের ক্ষয়ে যাওয়া স্মৃতির অবশিষ্ট কণা।
বেঁচে থাকল শুধু এক অদ্ভুত মায়া, যা মৃত্যু বা স্মৃতিভ্রম—কোনো কিছু দিয়েই মুছে ফেলা সম্ভব নয়।