গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অনুসরণীয় উদ্যোগ
· Prothom Alo

আমাদের সমাজে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিকাশ ও শিক্ষার পথ এখনো বহু বাধা ও সামাজিক অবহেলায় পূর্ণ। অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সংবেদনশীলতার অভাবে এমন হাজারো শিশু ঘরে বন্দিজীবন কাটাতে বাধ্য হয়। এই বাস্তবতার মাঝে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ‘মাহমুদা আদর্শ প্রতিবন্ধী স্কুল’ একটি অনন্য নজির তৈরি করেছে। নিজের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সন্তানকে কোনো স্কুলে ভর্তি করাতে না পেরে শামছুন্নাহার কবির নামের এক মায়ের শুরু করা এই উদ্যোগ এখন ৮০টি শিশুর বিনা মূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অন্যতম ভরসাস্থল।
Visit freshyourfeel.org for more information.
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৪ সালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় একটি ভাড়া বাসায় মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন শামছুন্নাহার কবির। এখন এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে নিজস্ব জমিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০২২ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন লাভ করেছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট এবং সামাজিক অবহেলার বাস্তবতায় বিদ্যালয়টি এখন অনেক পরিবারের ভরসার জায়গা। পাঁচজন শিক্ষক এখানে পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শিশুদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, কুটিরশিল্প, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পারদর্শী করে তুলছেন। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক অর্জন হলো এই বিদ্যালয়ের ২০ জন শিক্ষার্থীকে তাদের উপযোগী কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করাও সম্ভব হয়েছে।
কালিয়াকৈরের এই সাফল্য যেমন আমাদের অনুপ্রাণিত করে, তেমনি তা দেশের সার্বিক বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার অপর্যাপ্ততাকেও স্পষ্ট করে তোলে। দেশের বহু উপজেলায় এখনো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য কোনো সরকারি বা সমন্বিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। ফলে শামছুন্নাহার কবিরের মতো মহতী মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোই এসব প্রান্তিক পরিবারের একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠে। কিন্তু কেবল ব্যক্তি উদ্যোগ বা স্থানীয় অনুদানের ওপর ভর করে জাতীয় পর্যায়ে একটি টেকসই ও সর্বজনীন বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
বিদ্যালয়টিতে সরকারি ভাতা, বই বিতরণ ও প্রশাসনিক তদারকি অব্যাহত রাখা এবং গাজীপুর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতার আশ্বাস প্রশংসনীয়। তবে এই সহায়তাকে কেবল ভাতা বা উপহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এসব বিশেষায়িত স্কুলের জন্য প্রয়োজন মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ ও আধুনিক থেরাপির উপকরণ নিশ্চিতকরণ। বিশেষ শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের নিয়োগের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী অবকাঠামোগত বাজেট বরাদ্দ করাও প্রয়োজন।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মূলধারার সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো করুণা বা দয়ার বিষয় নয়, এটি তাদের মৌলিক, মানবিক ও সাংবিধানিক অধিকার। তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করতে হবে। এর জন্য জেলা ও উপজেলায় গাজীপুরের মাহমুদা আদর্শ প্রতিবন্ধী স্কুলের এই মডেলকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করা যায়। শামছুন্নাহার কবির ও তাঁর উদ্যোগকে আমাদের সাধুবাদ।