২২ দিনে ১২ হাজার কোটি টাকা আয়, ‘দ্য অডিসি’–এর সাফল্যের রহস্য কী

· Prothom Alo

ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা কি এখন আর শুধু সিনেমা নয়, একেকটি ‘ইভেন্ট’? প্রায় ৩ হাজার বছরের পুরোনো মহাকাব্য, তিন ঘণ্টার কাছাকাছি দৈর্ঘ্য, প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকনির্ভর গল্প—সব বাধা পেরিয়ে ‘দ্য অডিসি’ মাত্র তিন সপ্তাহেই এক বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে। আইম্যাক্সের রেকর্ড, ক্রিস্টোফার নোলানের ব্র্যান্ড ভ্যালু, তারকাবহুল অভিনয় এবং মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া প্রশংসা—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই অভূতপূর্ব সাফল্য। মুক্তির ২২ দিনেই সিনেমাটি আয় করেছে ১০০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি।

Visit milkshake.it.com for more information.

হলিউডে এক বিলিয়ন ডলার এখনো বিশেষ একটি মাইলফলক। কিন্তু ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য অডিসি’ যে গতিতে সেই মাইলফলকে পৌঁছেছে, সেটিই হয়তো আরও বেশি বিস্ময়কর। মুক্তির মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় বিশ্বব্যাপী সিনেমাটির আয় দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ৮ লাখ ডলার। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকা থেকে এসেছে ৪২ কোটি ৯৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৫৭ কোটি ৮৮ লাখ ডলার।

এটি নোলানের ২০১২ সালের ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস’–এর পর প্রথম সিনেমা, যা এক বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছাল। আর বর্তমান গতিপ্রকৃতি ঠিক থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই ‘দ্য অডিসি’ নোলানের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমা হয়ে যাবে। ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস’–এর ১০৮ কোটি ডলার এবং ‘দ্য ডার্ক নাইট’–এর ১০০ কোটি ৮ লাখ ডলারের রেকর্ড তখন পেছনে পড়ে যাবে।

তবে সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোন ধরনের সিনেমা এমন সাফল্য পেল। এটি কোনো সুপারহিরো সিনেমা নয়। কোনো দীর্ঘদিনের ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন কিস্তিও নয়। শিশু-কিশোরদের জন্য বানানো অ্যানিমেশনও নয়। প্রায় তিন ঘণ্টার এই সিনেমার ভিত্তি প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো একটি মহাকাব্য। আর গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন গ্রিক রাজা—ওডিসিউস। তাহলে কেন এত দর্শক?

নোলানের নামই এখন একটি ‘ব্র্যান্ড’
এর সবচেয়ে সহজ উত্তর—ক্রিস্টোফার নোলান। হলিউডে এমন পরিচালক খুব বেশি নেই, যাঁদের নতুন সিনেমার ঘোষণা নিজেই একটি বড় ঘটনা হয়ে ওঠে। নোলান এখন সেই বিরল তালিকার অন্যতম সদস্য। ‘দ্য ডার্ক নাইট’, ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘ডানকার্ক’, ‘টেনেট’ ও ‘ওপেনহেইমার’—একেকটি সিনেমা একেক ধরনের গল্প বলেছে। কিন্তু প্রতিবারই নোলান দর্শককে একটি বড় পর্দার অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘ওপেনহেইমার’–এর পর তাঁর প্রতি দর্শকের আস্থা আরও বেড়েছে।
একটি পরমাণু বোমা নির্মাণের ইতিহাস নিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টার, প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকনির্ভর একটি সিনেমা ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করবে—মুক্তির আগে এটি খুব সহজ কোনো পূর্বাভাস ছিল না।

‘দ্য অডিসি’ সিনেমার দৃশ্যে ম্যাট ডেমন ও জেনডায়া। আইএমডিবি

কিন্তু নোলান সেটি করেছেন। এরপর যখন তিনি ঘোষণা করলেন, এবার তিনি হোমারের ‘দ্য অডিসি’ নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছেন, তখন দর্শকের কাছে প্রশ্ন ছিল না—‘গল্পটা কী?’ প্রশ্ন ছিল—‘নোলান এই গল্প কীভাবে বানিয়েছেন?’ এই কৌতূহলই ‘দ্য অডিসি’–এর সবচেয়ে বড় বিপণন শক্তি। তিন হাজার বছরের পুরোনো গল্প, কিন্তু আবেগ একেবারেই আধুনিক।

হোমারের ‘দ্য অডিসি’ মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন মহাকাব্য। কিন্তু গল্পটির আবেগ আজও পরিচিত। একজন মানুষ দীর্ঘ যুদ্ধের পর বাড়ি ফিরতে চাইছে। পথে তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে বিপদ, প্রলোভন, শত্রু, অজানা জগৎ ও নিজের ভাগ্যের সঙ্গে। ওডিসিউসের এই বাড়ি ফেরার যাত্রার মধ্যে আছে পরিবার, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, যুদ্ধ, প্রতিশোধ, ক্ষমতা, অহংকার এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা; অর্থাৎ গল্পটি পুরোনো হলেও এর আবেগ পুরোনো নয়।

নোলানের অন্যতম বড় সাফল্য হলো, তিনি এই প্রাচীন মহাকাব্যকে শুধু গ্রিক পুরাণের সিনেমা হিসেবে উপস্থাপন করেননি। এটিকে বানিয়েছেন একটি বৃহৎ মানবিক অ্যাডভেঞ্চার। ফলে দর্শকের জন্য ‘দ্য অডিসি’ শুধু দেবতা, দানব আর প্রাচীন গ্রিসের গল্প নয়; এটি একজন মানুষের বাড়ি ফেরার গল্প। আর বাড়ি ফেরার গল্পের আবেদন কখনো পুরোনো হয় না।

আইম্যাক্স—সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রহস্যগুলোর একটি
সিনেমাটির ব্যবসায় আইম্যাক্সের ভূমিকা অবিশ্বাস্য। আইম্যাক্সে সিনেমাটির টিকিট বিক্রি থেকে এখন পর্যন্ত এসেছে প্রায় ২৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এত বিশাল অঙ্কের অর্থ মানে শুধু অতিরিক্ত কিছু দর্শক নয়; বরং এটি দেখিয়ে দেয়, সিনেমাটি দর্শকের কাছে একটি ‘প্রিমিয়াম থিয়েট্রিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স’ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ দর্শক শুধু সিনেমাটি দেখতে চাননি। তাঁরা চেয়েছেন সেরা পর্দায়, সবচেয়ে বড় শব্দে, সবচেয়ে বড় ছবিতে দেখতে।

এই জায়গাতেই নোলানের পরিকল্পনা সফল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সিনেমা হলের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। ‘ডানকার্ক’, ‘টেনেট’, ‘ওপেনহাইমার’—প্রতিটি সিনেমার ক্ষেত্রেই আইম্যাক্স ও বড় পর্দাকে সামনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ‘দ্য অডিসি’–এর ক্ষেত্রে সেটি যেন আরও বড় মাত্রা পেয়েছে। আইম্যাক্স জানিয়েছে, সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই সিনেমাটি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমা হয়ে উঠবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। স্ট্রিমিংয়ের যুগে দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে আনার জন্য শুধু ‘ভালো সিনেমা’ যথেষ্ট নয়। এমন কিছু দিতে হবে, যা বাড়িতে বসে একইভাবে উপভোগ করা সম্ভব নয়। নোলান সেটিই দিয়েছেন।

‘দ্য অডিসি’ সিনেমায় ম্যাট ডেমন। আইএমডিবি

এক বিলিয়ন ডলার—চীনে মুক্তির আগেই!
‘দ্য অডিসি’র সাফল্যের সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যগুলোর একটি হলো, সিনেমাটি চীনে মুক্তির আগেই এক বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চলচ্চিত্র বাজার। সেখানে সিনেমাটি ১৪ আগস্ট মুক্তির কথা রয়েছে। দেশটিতে প্রায় ৮০০টি আইম্যাক্স স্ক্রিনে সিনেমাটি দেখানো হবে। এর পাশাপাশি হাজার হাজার সাধারণ প্রেক্ষাগৃহেও চলবে; অর্থাৎ যে বাজার থেকে এখনো একটি বড় অংশের আয় আসেনি, সেখানেই সামনে রয়েছে আরও বড় সম্ভাবনা।

এ কারণেই ‘দ্য অডিসি’র চূড়ান্ত আয় এক বিলিয়ন ডলারে থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম; বরং প্রশ্ন এখন অন্য—দেড় বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি যেতে পারবে কি? সেটি সময়ই বলবে। তবে চীনে মুক্তির আগে এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাওয়া নিজেই সিনেমাটির আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার বড় প্রমাণ।

‘ওয়ার্ড অব মাউথ’ এবার নোলানের পক্ষে
বক্স অফিসে প্রথম সপ্তাহের সাফল্য অনেক সময় বিজ্ঞাপন ও ভক্তদের আগ্রহের ফল হতে পারে। কিন্তু তৃতীয় সপ্তাহে এসেও সিনেমা শক্তিশালী থাকলে বুঝতে হয়, দর্শক সিনেমাটি পছন্দ করছে। ‘দ্য অডিসি’র ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে। সিনেমাটির সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি হলো ইতিবাচক দর্শক প্রতিক্রিয়া। দর্শকের মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়েছে। ফলে যারা প্রথম সপ্তাহে সিনেমাটি দেখেননি, তাঁরাও পরে হলে গেছেন। এটিই ‘ওয়ার্ড অব মাউথ’। একজন দর্শক বন্ধুকে বলেছেন, ‘সিনেমাটি বড় পর্দায় দেখতে হবে।’ বন্ধু আরেকজনকে বলেছেন। এভাবে তৈরি হয়েছে এমন এক দর্শকচক্র, যা শুধু উদ্বোধনী সপ্তাহান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়।

‘দ্য অডিসি’ সিনেমায় অ্যান হ্যাথওয়ে। আইএমডিবি

তারকারাও কম গুরুত্বপূর্ণ নন
নোলানের সিনেমায় সাধারণত তারকা থাকেন, কিন্তু তাঁদের উপস্থিতি প্রচলিত তারকানির্ভর ব্লকবাস্টারের মতো নয়। ‘দ্য অডিসি’র সেই মডেল দেখা গেছে। ওডিসিউস চরিত্রে ম্যাট ডেমন। তাঁর সঙ্গে আছেন অ্যান হ্যাথাওয়ে, টম হল্যান্ড, জেন্ডায়া, রবার্ট প্যাটিনসনসহ একাধিক জনপ্রিয় তারকা। একজন অভিনেতার ভক্ত অন্য অভিনেতার ভক্তকে সিনেমার দিকে টেনে এনেছেন। ম্যাট ডেমনের দীর্ঘদিনের দর্শক যেমন আছেন, তেমনি টম হল্যান্ড ও জেন্ডায়ার তরুণ ভক্তদেরও বিশাল অংশ রয়েছে।

ফলে সিনেমাটি শুধু নোলানের পুরোনো দর্শকের ওপর নির্ভর করেনি। একই সিনেমায় বিভিন্ন প্রজন্মের তারকার উপস্থিতি দর্শকভিত্তি আরও বড় করেছে। সবচেয়ে বড় চমক—এটি একটি ‘অ্যাডাল্ট-স্কিউয়িং’ সিনেমা আজকের ব্লকবাস্টার বাজারে সবচেয়ে বড় দর্শকগোষ্ঠী সাধারণত পরিবার ও তরুণ দর্শক। সুপারহিরো সিনেমা, অ্যানিমেশন, ফ্র্যাঞ্চাইজি—সবকিছুরই একটি বড় অংশ তরুণদের কেন্দ্র করে।

‘দ্য অডিসি’ পথ অনুসরণ করেনি। এটি প্রায় তিন ঘণ্টার সিনেমা। গল্প জটিল। এর উৎস একটি প্রাচীন মহাকাব্য। বিষয়বস্তুও শিশু-কিশোরদের জন্য তৈরি করা নয়, তারপরও এটি এক বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।

এই সাফল্য প্রমাণ করে, প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের জন্য বানানো বড় সিনেমার বাজার এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী। শর্ত একটাই—দর্শককে এমন একটি অভিজ্ঞতা দিতে হবে, যার জন্য তাঁরা টাকা খরচ করে হলের আসনে বসতে রাজি।
নোলানের সবচেয়ে বড় শক্তি: তিনি সিনেমাকে ‘ঘটনা’ বানাতে জানেন। হয়তো এটাই ‘দ্য অডিসি’র সাফল্যের বড় রহস্য।

৫ হাজার কোটি টাকা আয়! কোন জাদুতে মুগ্ধ করল ‘দ্য অডিসি’

২০২৬ কি তাহলে আবার ‘বিলিয়ন ডলার বছর’
‘দ্য অডিসি’এক বিলিয়ন ডলার ছোঁয়ার মাধ্যমে ২০২৬ সালের পঞ্চম সিনেমা হিসেবে এই ক্লাবে ঢুকেছে। এর আগে ‘স্পাইডার–ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ প্রায় ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে এবং এখনো ব্যবসা করছে। ‘টয় স্টোরি ৫’ পৌঁছেছে প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৬৭ বিলিয়ন ডলারে। ‘দ্য সুপার মারিও গ্যালাক্সি মুভি’ ও ‘মাইকেল’ও এক বিলিয়ন ডলারের ঘরে ঢুকেছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এক বছরে এতগুলো সিনেমার এক বিলিয়ন ডলার আয় বিরল।

২০১৯ সালে রেকর্ড ৯টি সিনেমা এক বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল। এরপর মহামারির ধাক্কায় সিনেমা হলের ব্যবসায় বড় পরিবর্তন আসে। পরবর্তী কোনো বছরেই তিনটির বেশি সিনেমা এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারেনি। ২০২৬ সেই ধারায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এখানেও ‘দ্য অডিসি’–এর গুরুত্ব আছে। কারণ, এটি শুধু নিজে ব্যবসা করছে না, এটি প্রমাণ করছে, দর্শক এখনো বড় সিনেমার জন্য বড় পর্দায় ফিরতে প্রস্তুত।

ভ্যারাইটি ও ডেডলাইন অবলম্বনে

Read full story at source