২৫০ শয্যার সেবার জন্য আর কত অপেক্ষা
· Prothom Alo
সাড়ে ৯ বছরে মাত্র ১০টি শয্যা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১০টি শয্যা। চালু হয়নি আর ২৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ সেবা, যে কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের।
বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে গত মঙ্গলবার দুপুরে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন বটিয়াঘাটা উপজেলার শিয়ালীডাঙ্গা গ্রামের বৃদ্ধ আনসার শিকারী। হাসপাতালে ভর্তি হলেও প্রথমে পাননি শয্যা। তিনতলা মূল ভবনের সিঁড়ির পাশের সামান্য ফাঁকা জায়গায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন।
Visit sportbet.reviews for more information.
আনসার শিকারীর সঙ্গে ছিলেন তাঁরা ছেলে ফেরদৌস শিকারী ও নাতি ফয়সাল শিকারী। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে আলাপকালে ফয়সাল শিকারী প্রথম আলোকে বলেন, বুধবার রাতে তাঁর দাদা শয্যা পেয়েছেন। বেসরকারি হাসপাতালে অনেক খরচ। তাই এখানে রেখেই তাঁকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
শুধু আনসার শিকারী নন, হাসপাতালের অন্যান্য অংশেও একই চিত্র। রূপসার যুগহাটি গ্রামের রাজু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নিচতলার বারান্দায় অন্য রোগীদের মতো বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি।
১০০ শয্যার খুলনা জেনারেল হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। এরপর সাড়ে ৯ বছরে মাত্র ১০টি শয্যা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১০টি শয্যা। চালু হয়নি আর ২৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ সেবা, যে কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের।
১৯৩৮ সালে ভৈরব নদের তীরে প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতাল ‘সদর হাসপাতাল’ নামেও পরিচিত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১৬৫ রোগী। এর মধ্যে পুরুষ ৬৮ ও নারী ৯৭ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত শয্যার চেয়ে ৫৫ জন বেশি রোগী ভর্তি ছিলেন।
শুধু ১৮ আগস্টের চিত্র নয়, বছরজুড়েই এ হাসপাতালে রোগীর চাপ থাকে। ২০২৫ সালে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ জন। জরুরি বিভাগে সেবা নিয়েছেন ২৬ হাজার ২০১ জন এবং ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ৩৭ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ লাখ ২১ হাজার ৯৫৪ জন। এ সময় জরুরি বিভাগে সেবা নিয়েছেন ১৫ হাজার ৫০৭ জন এবং ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৯৮৭ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম সাড়ে ৭ মাসে প্রতিদিন গড়ে ৯৭৩ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন।
খুলনা নগর ও জেলার পাশাপাশি পাশের বিভিন্ন জেলার মানুষও এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। রোগীর চাপ বেশি থাকায় শয্যা সংকটে অনেক রোগীকে ভর্তি রাখা সম্ভব হয় না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নতুন ১২ তলা ভবনের ভিত্তি দিয়ে ৬ তলা পর্যন্ত নির্মাণের জন্য একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালের আগস্টে। কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। ২০২৪ সালে প্রকল্পটি বাতিল হয়। এরপর ছয়তলার অসম্পন্ন অংশ নির্মাণ এবং ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের প্রকল্প নেওয়া হয়। সে প্রকল্পের কাজ এখন চলছে।
ভবন নির্মাণে নতুন করে ২০ কোটি ৪৩ লাখ টাকার চুক্তি
গণপূর্ত বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ এপ্রিল ৬ তলা ভবনের অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে ৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকার চুক্তি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সপ্তম ও অষ্টম তলা নির্মাণের জন্য মেসার্স লেলিন ট্রেডার্সের সঙ্গে ১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার চুক্তি হয়। এ কাজের মেয়াদ ২০২৭ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ছয়তলা ভবনের মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও কাঠের ও বৈদ্যুতিক কাজ বাকি রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ছয়তলা ভবনের কাজ শেষ হলে হাসপাতালের কার্যকর শয্যাসংখ্যা হবে ১৭৬। বর্তমানে যে দুটি ভবন ব্যবহৃত হচ্ছে, চতুর্থ তলা ভবনটির পুরোটা গাইনি বিভাগ হিসেবে ব্যবহার করা গেলে পূর্ণাঙ্গ শয্যার সেবা চালু করা সম্ভব হবে।
খুলনা গণপূর্ত উপবিভাগ-১–এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী দীপক চন্দ্র শীল বলেন, ৩২ কোটি টাকার চুক্তির বিপরীতে ২৩ কোটি টাকার বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল। ওই বরাদ্দের পুরো কাজ ঠিকাদার করেছেন। পরে ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি বাতিল করা হয়।
পুরোনো ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার দেয়াল ও ছাদের অবস্থাও নাজুক। ফলে মূল ভবনটি দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ জন্য পুরুষ বহির্বিভাগ তিনতলা মূল ভবনের সামনের রাস্তার বিপরীত পাশে টিনশেডে পরিচালিত হচ্ছে। আর নারীদের বহির্বিভাগ সেবা চলছে চারতলা ভবনে।
অনুমোদন ২৫০ শয্যার, চলছে ১১০ শয্যায়
২৫০ শয্যার জন্য জনবল, পদায়ন ও ওষুধ সরবরাহের অনুমোদন থাকলেও নতুন ভবন নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকায় পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করা যায়নি। হাসপাতালে বর্তমানে দুটি ভবন। একটি তিনতলা মূল ভবন, অপরটি চারতলা ভবন। এ দুটি ভবনে ১১০ শয্যার সেবা চালু আছে। তবে মূল ভবনের তৃতীয় তলায় পেয়িং ও কেবিনের একটি অংশ ২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরোনো ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার দেয়াল ও ছাদের অবস্থাও নাজুক। ফলে মূল ভবনটি দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ জন্য পুরুষ বহির্বিভাগ তিনতলা মূল ভবনের সামনের রাস্তার বিপরীত পাশে টিনশেডে পরিচালিত হচ্ছে। আর নারীদের বহির্বিভাগ সেবা চলছে চারতলা ভবনে।
মো. রফিকুল ইসলাম, খুলনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কপ্রকল্পে জটিলতা, কাজে গাফিলতি ও নানা সমস্যার কারণে হাসপাতালের কাজ দীর্ঘদিন আটকে ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন প্রকল্পে আবার কাজ শুরু হয়েছে। নতুন ভবনের কাজ শেষ হলে ১০টি সাধারণ সিসিইউ, ১০টি আইসিইউ ও ১০টি স্ক্যানো শয্যা চালু করা হবে।৩০ শয্যার আইসিইউ-এইচডিইউ, নেই জনবল-সরঞ্জাম
বর্তমানে এ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও উচ্চনির্ভরশীলতা কেন্দ্রের (এইচডিইউ) সেবা চালু নেই। তবে ১২টি আইসিইউ শয্যা ও ১৮ এইচডিইউ শয্যা পড়ে আছে। এ ৩০ শয্যার দুটি ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা, জনবল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি এখনো আসেনি।
চিকিৎসকসংকটও রয়েছে ২৫০ শয্যার জন্য অনুমোদিত এ হাসপাতালে। চিকিৎসকসহ ৮৬টি পদের মধ্যে ৪৮টি শূন্য।
পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালুর প্রস্তুতি রয়েছে উল্লেখ করে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রফিকুল ইসলাম গাজী প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পে জটিলতা, কাজে গাফিলতি ও নানা সমস্যার কারণে হাসপাতালের কাজ দীর্ঘদিন আটকে ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন প্রকল্পে আবার কাজ শুরু হয়েছে। নতুন ভবনের কাজ শেষ হলে ১০টি সাধারণ সিসিইউ, ১০টি আইসিইউ ও ১০টি স্ক্যানো শয্যা চালু করা হবে। পাশাপাশি এমআরআই, সিটি স্ক্যান ও ম্যামোগ্রাফি সেবাও চালু করা হবে।