গিঁটে গিঁটে ফ্যাশনের নতুন গল্প
· Prothom Alo
সুতা আর গিঁটের প্রাচীন কারুশিল্প ম্যাক্রেমকে নতুনভাবে পোশাকের ভাষায় তুলে ধরেছেন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) শিক্ষার্থী শ্রেয়া রায়। তাঁর সংগ্রহে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের সঙ্গে মিশেছে সমকালীন ফ্যাশনের নান্দনিকতা। একই সঙ্গে হাতে তৈরি ম্যাক্রেমের ধীর বুননপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শ্রেয়া সামনে এনেছেন স্লো ফ্যাশনের ভাবনাও।
Visit goldparty.lat for more information.
সাজসজ্জা কিংবা অন্দরসজ্জার উপকরণ হিসেবে ম্যাক্রেম আমাদের পরিচিত। কিন্তু সেই পরিচিত মাধ্যম দিয়েই যখন তৈরি হয় পোশাক, তখন তা হয়ে ওঠে একেবারে অন্য রকম কিছু। সুতা, গিঁট আর হাতে তৈরি নকশার সমন্বয়ে শতাব্দীপ্রাচীন এই কারুশিল্পকে সমসাময়িক ফ্যাশনে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন বিইউএফটির শিক্ষার্থী শ্রেয়া রায়।
তাঁর ফ্যাশন কালেকশন ডেভেলপমেন্ট স্টুডিও কোর্সের প্রকল্পে ম্যাক্রেম শুধু পোশাকের অলংকরণ নয়, হয়ে উঠেছে পুরো সংগ্রহের মূল উপাদান। তাঁর তৈরি পাঁচটি পোশাকে দেখা গেছে গিঁট, জাল, ঝুল ও নকশার নানা রকম বিন্যাস। তাঁর এই কালেকশন দেখে মনে হচ্ছে যেন কারুশিল্প আর আধুনিক ফ্যাশন মিলেছে একসঙ্গে। এই সংগ্রহের নাম ‘দ্য ম্যাক্রেম এজ’। প্রথম সংগ্রহটি কী নিয়ে করবেন, ভাবতে গিয়েই ম্যাক্রেমকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। এমন একটি মাধ্যম নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন, যার নির্মাণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে তাঁর নিজের সৃজনশীলতার যোগ থাকবে। ম্যাক্রেমের সঙ্গে পরিচয় ও কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই ধীরে ধীরে সেই ভাবনা রূপ নেয় পূর্ণাঙ্গ একটি পোশাক সংগ্রহে।
যেভাবে শুরু হলো ভাবনা
প্রথম সংগ্রহটি নিয়ে ভাবতে বসে শ্রেয়ার ইচ্ছা ছিল, এমন কিছু তৈরি করার, যা শুধু পোশাক হয়ে থাকবে না; তার ভেতরে থাকবে একটি গল্প। সেই ভাবনা থেকেই ম্যাক্রেমকে বেছে নেওয়া। হাতের কাজের প্রতি আগ্রহ আগে থেকেই ছিল তাঁর।
ম্যাক্রেমের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর মনে হয়েছে, গিঁট আর সুতার এই কাজের মধ্যেই এমন একটি সম্ভাবনা আছে, যার মাধ্যমে নিজের ভাবনাটিকে পোশাকে প্রকাশ করা যায়। এরপর ধীরে ধীরে সেই ভাবনাই রূপ নেয় ‘দ্য ম্যাক্রেম এজ’ সংগ্রহে।
ম্যাক্রেম মূলত গিঁটের মাধ্যমে নকশা তৈরির একটি হস্তশিল্প। বিভিন্ন ধরনের গিঁটের বিন্যাসে তৈরি হয় জাল, ঝালর, রেখা কিংবা নানা জ্যামিতিক ও অলংকারধর্মী নকশা। শ্রেয়ার সংগ্রহেও সেই বৈশিষ্ট্যই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। কোথাও ঘন গিঁটের কাজ, কোথাও ফাঁকা জালের মতো বিন্যাস, আবার কোথাও লম্বা ঝুল—একই কৌশল ব্যবহার করে তিনি তৈরি করেছেন ভিন্ন ভিন্ন পোশাকের সিলুয়েট।
ম্যাক্রেমের পুরোনো কারুশিল্পের ঐতিহ্য এবং সমকালীন ফ্যাশনে এর নতুন করে ফিরে আসার বিষয়টিও শ্রেয়াকে আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে হাতে তৈরি কাজের ধীরগতি তাঁর ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। দ্রুত উৎপাদন ও দ্রুত বদলে যাওয়া ফ্যাশনের বিপরীতে ম্যাক্রেমে প্রতিটি গিঁট তৈরি করতে সময়, শ্রম ও ধৈর্য লাগে। শ্রেয়ার কাছে এই ধীর নির্মাণপ্রক্রিয়াই কাজটির অন্যতম সৌন্দর্য।
আন্তর্জাতিক ফ্যাশনেও ম্যাক্রেমের ব্যবহার তাঁর ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। ডিওরের ক্রুজ ২০২০ সংগ্রহ, মার্কিন ডিজাইনার উল্লা জনসন ও ফরাসি ডিজাইনার ইসাবেল মারাঁর কাজ থেকে তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। পাশাপাশি শিল্পী শিলা হিকস ও জুডিথ স্কটের সুতাকে শিল্পের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা কাজ তাঁকে আরও ভাবিয়েছে—সুতা যে শুধু পোশাক তৈরির উপকরণ নয়, নিজেই হয়ে উঠতে পারে শিল্পের ভাষা। সেই ভাবনাই শেষ পর্যন্ত শ্রেয়ার সংগ্রহে এসে গিঁটে গিঁটে একটি নতুন ভাষা তৈরি করেছে।
ফাস্ট ফ্যাশনের বিপরীতে স্লো ফ্যাশনের বার্তা
দ্রুত উৎপাদন ও বদলে যাওয়া ফ্যাশনের সময়ে ম্যাক্রেমকে বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল সচেতন সিদ্ধান্ত। ফাস্ট ফ্যাশনের বিপরীতে হাতে তৈরি পোশাকের ধীর বুননপ্রক্রিয়া, দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং কারুশিল্পের মূল্যকে সামনে আনতেই এই মাধ্যম বেছে নিয়েছেন শ্রেয়া।
একটি পোশাক তৈরিতে প্রতিটি গিঁট হাতে বাঁধতে হয়; ফলে এখানে সময় ও শ্রম—দুটিরই প্রয়োজন বেশি। এই ধীর বুননপ্রক্রিয়াই শ্রেয়ার সংগ্রহকে স্লো ফ্যাশনের ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
দ্রুত তৈরি করে দ্রুত বদলে ফেলার বদলে একটি পোশাককে যত্ন নিয়ে তৈরি করা এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের উপযোগী করে তোলাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাবনাটি অনেকটা এমন—কম তৈরি করা, ভালোভাবে তৈরি করা এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার করা। ম্যাক্রেমের প্রতিটি পোশাকে সেই দর্শনেরই ছাপ রয়েছে
পাঁচ পোশাকে পাঁচ রকম আমেজ
এই কালেকশনের পাঁচটি আউটফিটই তৈরি হয়েছে হাতে বোনা ম্যাক্রেমে, মূলত মেরুন ও অফহোয়াইট সুতার বৈপরীত্যে। তবে একই উপকরণ ব্যবহার করেও প্রতিটি পোশাকের সিলুয়েট ও উপস্থাপনায় প্রকাশ পেয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
কোথাও মেরুন ম্যাক্রেমের টিউব-বডিসের সঙ্গে জালি বোনা স্কার্ট, কোথাও হল্টারনেক ক্রপ টপের সঙ্গে সাদা ট্রাউজার, তাতে মেরুন ম্যাক্রেমের লতানো নকশা। আরেকটি লুকে মেরুন টপের সঙ্গে সাদা ম্যাক্রেমের হল্টার নেকলাইন নজর কাড়ছে, সঙ্গে রয়েছে অ্যাসিমেট্রিক স্কার্ট। অন্য লুকে সাদা ম্যাক্রেমের ব্রালেটের সঙ্গে লম্বা ঝালরে বোনা স্কার্ট, আর শেষের লুকে সাদা ম্যাক্রেম টপে মেরুন কাট–আউটের নকশা, সঙ্গে লম্বা ঝালরের স্কার্ট প্যানেল। পোশাকের সঙ্গে অলংকরণেও রয়েছে একই উপকরণের ছাপ। ফলে কোথাও কোথাও পোশাক আর অলংকারের সীমারেখাও যেন মিলেমিশে গেছে।
একই ম্যাক্রেম বুননকে পাঁচটি ভিন্ন সিলুয়েটে রূপ দিয়ে শ্রেয়া পরিচিত এই হস্তশিল্পের উপকরণকে নিয়ে এসেছেন সমসাময়িক ফ্যাশনের এক স্বতন্ত্র ভাষায়। সবচেয়ে বড় কথা, শ্রেয়ার সংগ্রহটি ম্যাক্রেমকে কোনো পুরোনো কারুশিল্পের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখেনি। বরং প্রাচীন এই গিঁটের কৌশলকে আধুনিক ফ্যাশনে বসিয়ে দিয়েছে নতুন পরিচয়।