নাটকের নাম মলুয়া, বারবার ‘হাউসফুল’, দর্শক দেড় ঘণ্টা আটকে থাকেন যে গল্পে

· Prothom Alo

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা। সেগুনবাগিচার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলের সামনে টিকিটের জন্য ভিড়। কাউন্টার থেকে বারবার ঘোষণা হচ্ছিল, টিকিট প্রায় শেষ। লবিতে ঢুকতেই দেখা গেল দীর্ঘ লাইন। দর্শকের জন্য ছিল চা, বাতাসা ও খই।

Visit bettingx.bond for more information.

সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে বন্দনা দিয়ে শুরু হয় নাটক ‘মলুয়া’। এক গায়েন শুরুতেই দর্শকদের বললেন, ‘এটা গেটলক সার্ভিস। ঢোকার, বের হওয়ার আর সুযোগ নেই। মানে হলের বাইরে ছিটকিনি লাগানো। কেউ ঢুকতেও পারবে না, বাহিরও হইতে পারবে না।’ শুরু হয় মলুয়াযাত্রা।

দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত মৈমনসিংহ গীতিকার বহুল আলোচিত পালা অবলম্বনে থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানির প্রথম প্রযোজনা ‘মলুয়া’। নির্দেশনা সাইফুল জার্নালের।

কী আছে গল্পে

মলুয়া ও চাঁদ বিনোদের প্রেম দিয়ে গল্পের শুরু। বিয়ে করে সুখেই দিন কাটছিল তাদের। কিন্তু গ্রামের ক্ষমতাবান কাজির নজর পড়ে মলুয়ার ওপর। বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে মলুয়া প্রত্যাখ্যান করে। এরপর শুরু হয় প্রতিশোধ।

বিনোদের ওপর চাপানো হয় বড় অঙ্কের কর। একে একে সম্পদ হারায় বিনোদ। পরে বিনোদকে নিরলক্ষাইয়ের বিলে বন্দী করা হয়। মলুয়াকে যেতে হয় দেওয়ানের হাওলিতে। দেওয়ানও তাকে বিয়ে করতে চায়। বুদ্ধি ও সাহস দিয়ে সেখান থেকেও নিজেকে রক্ষা করে মলুয়া।

বিপদ সেখানেই শেষ হয় না। বিনোদের সঙ্গে গ্রামে ফেরার পর নিজের মানুষদের কাছেই অপমানিত হতে হয় তাকে। সমাজের চোখে হয়ে যায় সন্দেহভাজন, অপয়া। যে নারী বারবার নিজের সততা রক্ষা করেছে, তাকেই চরিত্রহীন বলে অপবাদ দেওয়া হয়।

বিনোদের সংসারেও স্ত্রী হিসেবে জায়গা হয় না মলুয়ার, থাকতে হয় দাসী হয়ে। এর মধ্যে বিনোদ সাপের কামড়ে মৃত্যুর মুখে পড়লে তাকে বাঁচাতে ছুটে যায় মলুয়া। এই জায়গায় এসে প্রেমের গল্পটি হয়ে ওঠে একজন নারীর ভালোবাসা, দায়িত্ব ও আত্মমর্যাদার লড়াইয়ের গল্প।

তরুণ দর্শকের সঙ্গে ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ দর্শকেরা, অনেকেই এসেছিলেন পরিবারসহ

কে কেমন করলেন

মলুয়া চরিত্রে অভিনয় করেছেন হুমায়রা স্নিগ্ধা, প্রেমা ও নানজীবা শৈলী। একই চরিত্রে তিন শিল্পীর উপস্থিতি প্রযোজনাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁদের অভিনয়ে মলুয়া কোনো নির্দিষ্ট সময়ের একজন নারী না থেকে অনেক নারীর প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

চাঁদ বিনোদ চরিত্রে অভিনয় করেছেন হাসনাত রিপন। অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচিতি আছে তাঁর। এ নাটকে তাঁর অভিনয় বেশ শক্তিশালী ছিল। প্রেমিক থেকে স্বামী, পরে সামাজিক চাপের কাছে নত হয়ে যাওয়া বিনোদের পরিবর্তন অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন রিপন।

প্রিয়ম মজুমদারকে দেখা গেছে কখনো বিনোদ, কখনো ঘটক, কখনো গায়েনের চরিত্রে। চরিত্র বদলের সঙ্গে তাঁর শরীরী অভিনয় ও কমেডির জায়গাগুলো ছিল উপভোগ্য। হীরাধর চরিত্রে শাহরিয়ার সজীব এবং কাজি চরিত্রে পি কে ফজলের অভিনয়ও দর্শকদের হাসিয়েছে।

বিনোদ, লোক, গায়েন ও বাদক চরিত্রে গোপী দেবনাথ ও ধ্রুব, মা চরিত্রে অরিন, দেওয়ান চরিত্রে শাহীন সাইদুর এবং গায়েনের চরিত্রে নুসরাত জাহান ইরাও সমানতালে অভিনয় করেছেন।

একই চরিত্রে একাধিক শিল্পীর অভিনয় ও একজন শিল্পীর একাধিক চরিত্রে চলে যাওয়া প্রযোজনাটিকে প্রচলিত নাট্যরীতি থেকে আলাদা করেছে। তবে অভিনয়ের সঙ্গে কোরিওগ্রাফি, আলোক পরিকল্পনা, পোশাক ও মঞ্চসজ্জাও নাটকটিকে দর্শকের কাছে উপভোগ্য করেছে।

‘যতবার শো হবে, ততবার দেখব’

নাটকের শেষে ‘কাংখেতে গাগরী কন্যা’ গানের সঙ্গে কলাকুশলীরা নগরকীর্তনের মতো করে মঞ্চ প্রদক্ষিণ করেন। দর্শকেরাও হাততালি দিয়ে গানের সঙ্গে তাল মেলান। এরপর কলাকুশলীরা দর্শকদের অভিবাদন জানালে হলজুড়ে দীর্ঘ করতালি পড়ে।

বের হতে হতে দর্শকদের মুখে ছিল নাটকের প্রশংসা। তরুণ দর্শকের সঙ্গে ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ দর্শকেরা, অনেকেই এসেছিলেন পরিবারসহ। প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের বর্ষীয়ান প্রযোজক হাবিবুর রহমান। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘হঠাৎ বৃষ্টি’, ‘শঙ্খচিল’ ও ‘মনের মানুষ’-এর মতো সিনেমার প্রযোজক তিনি। প্রদর্শনী শেষে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় মলুয়া যতবার মঞ্চস্থ হবে, আমি ততবারই দেখতে আসব।’

‘মলুয়া’র প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হল ছিল দর্শকে পূর্ণ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়

সব শো হাউসফুল

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তিনটি হল মিলিয়ে পুরো মাসে নাটকের প্রদর্শনী হয় ৬৫–৭০টি। এর মধ্যে পুরোনো দলগুলোর জনপ্রিয় নাটকগুলোতেই দর্শকের ভিড় বেশি থাকে। তবে এখানে ব্যতিক্রম থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানি। নতুন দল হওয়ার পরও তাদের প্রথম প্রযোজনা ‘মলুয়া’র চারটি প্রদর্শনীর প্রতিটি ছিল হাউসফুল। এর আগে শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে দুটি আর বনানীর যাত্রা বিরতিতে একটি প্রদর্শনী হয়েছে ‘মলুয়া’র।

নির্মাতা যা বলছেন

পুরোনো পালার কাঠামো রেখে সমকালীন উপাদানের মিশেলে ‘ফোক ফিউশন’ ভাবনায় প্রযোজনাটি তৈরি করেছেন সাইফুল জার্নাল। নাটকটি নিয়ে তিনি বলেন, ‘অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে সমাজ, শিল্প, মানবিকতা এবং সৃষ্টির উৎস নারীরা যখন অবহেলা ও অপমানের শিকার হন, তখনই প্রয়োজন হয় একজন মলুয়া, মহুয়া, ভেলুয়া কিংবা বেহুলার। তাঁরাই আমাদের প্রতিবাদ করতে, মাথা তুলে দাঁড়াতে শেখান। তাই তাঁদের গল্প কখনো পুরোনো হয় না, বরং প্রতিটি সময়েই নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে।’ নির্মাতা জানান, কয়েকটি নাটকের দলের সদস্য ও দুটি ব্যান্ডের শিল্পীদের যৌথ উদ্যোগ হলো ‘থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানি’।

Read full story at source