যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করে প্রশংসা পেয়েছিলেন, তাঁর লড়াই অনুপ্রাণিত করেছে অন্যদেরও
· Prothom Alo

হলিউডে তাঁর অভিষেক হয়েছিল শিশু অভিনেত্রী হিসেবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক জটিল চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইভান র্যাচেল উড। ‘থার্টিন’, ‘দ্য রেসলার’, ‘অ্যাক্রস দ্য ইউনিভার্স’ বা ‘ওয়েস্টল্যান্ড’; প্রতিটি কাজেই দেখা গেছে আলাদা এক ইভানকে। তবে অভিনয়ের বাইরেও তাঁর জীবনের একটি অধ্যায় তাঁকে গভীরভাবে আলোচনায় এনেছে। যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে বলা, সেই অভিযোগকে ঘিরে আইনি লড়াই এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ, সব মিলিয়ে ইভানের জীবন হয়ে উঠেছে সাহস ও সংগ্রামের গল্প।
Visit rouesnews.click for more information.
শিশু অভিনেত্রী থেকে হলিউডের পরিচিত মুখ
১৯৮৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর নর্থ ক্যারোলাইনার র্যালিতে জন্ম ইভানের। খুব অল্প বয়সেই অভিনয়ে আসেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ‘প্র্যাকটিক্যাল ম্যাজিক’-এ অভিনয় করে পরিচিতি পান। এরপর ‘থার্টিন’ ছবিতে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিদ্রোহী এক কিশোরীর চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পান। কৈশোর, যৌনতা, আত্মপরিচয় ও মানসিক অস্থিরতার মতো কঠিন বিষয় নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি তাঁকে হলিউডের তরুণ প্রতিভাদের কাতারে নিয়ে আসে।
এরপর ‘দ্য রেসলার’ ও ‘অ্যাক্রস দ্য ইউনিভার্স’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে নিজের পরিসর আরও বাড়ান ইভান। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মাইলফলক হয়ে আসে এইচবিওর সিরিজ ‘ওয়েস্টল্যান্ড’।
‘ডলোরেস’ তাঁকে দিল নতুন পরিচয়
‘ওয়েস্টল্যান্ড’-এ ডলোরেস অ্যাবারনাথি চরিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পান ইভান। অন্যের তৈরি এক জগতে নিজের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার অর্থ খুঁজতে থাকা ডলোরেস ধীরে ধীরে নিজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে নামে। চরিত্রটির জটিলতা অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলেন ইভান। পান গোল্ডেন গ্লোব ও এমির মতো গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারের মনোনয়ন।
ডলোরেসের গল্পটি কল্পকাহিনি হলেও চরিত্রটির ভেতরে স্বাধীনতা, নিয়ন্ত্রণ ও নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা, তা দর্শকের কাছে ইভানের পর্দার বাইরের লড়াইয়ের সঙ্গেও একধরনের প্রতিধ্বনি তৈরি করেছে।
হয়রানির বিরুদ্ধে সোাচ্চার
২০১৬ সালে ইভান প্রথমবার প্রকাশ্যে জানান, তিনি জীবনে দুবার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তখন অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম বলেননি। কয়েক বছর পর আরও সরাসরি কথা বলেন তিনি।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইভান জানান, তাঁর অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তি সংগীতশিল্পী ব্রায়ান ওয়ার্নার, যিনি মেরিলিন ম্যানসন নামে পরিচিত। ইভানের দাবি, তিনি কিশোরী বয়সে ম্যানসনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান এবং সেই সম্পর্কের সময়ে শারীরিক, যৌন ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
ইভান র্যাচেল উড। রয়টার্সইভানের বক্তব্য সামনে আসার পর আরও কয়েকজন নারী ম্যানসনের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেন। মুহূর্তেই বিষয়টি পরিণত হয় হলিউড ও সংগীতজগতের ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে বড় বিতর্কে। অনেক অভিনয়শিল্পী এভাবে সাহস নিয়ে যৌন নির্যাতনের কথা প্রকাশ করায় অভিনেত্রীর প্রশংসা করেন। ইভান র্যাচেল উড মুখ খোলার পর কথা বলেন নির্যাতনের শিকার অনেক তারকা থেকে সাধারণ মানুষও।
ম্যানসনের পাল্টা বক্তব্য ও আইনি লড়াই
ম্যানসন ইভানের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তাঁদের সম্পর্ক ছিল সম্মতিপূর্ণ এবং পরবর্তী সময়ে সেটিকে নির্যাতন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
২০২২ সালে ম্যানসন ইভানের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ইভান ও অন্যরা পরিকল্পিতভাবে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে ম্যানসন মামলাটি প্রত্যাহার করেন এবং ইভানের আইনি খরচ বহনের বিষয়ে সম্মত হন। কিন্তু একই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ফৌজদারি তদন্তও চলছিল।
তদন্তে মামলা হয়নি, বিতর্কও থামেনি
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লস অ্যাঞ্জেলেসের জেলা অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, ম্যানসনের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন ও পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা হবে না। পর্যাপ্ত প্রমাণের ঘাটতি এবং কিছু অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনি সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
নিজের গল্প নিজেই বললেন
অভিযোগ সামনে আনার পর ইভান থেমে থাকেননি। ২০২২ সালের তথ্যচিত্র ‘ফোনিক্স রাইজিং’-এ নিজের অভিজ্ঞতার বিস্তারিত তুলে ধরেন। পরিচালক অ্যামি বার্গের নির্মিত তথ্যচিত্রে ইভানের জীবনের নানা পর্যায়, নির্যাতনের অভিযোগ এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা উঠে এসেছে।
তথ্যচিত্রটি তাঁর জন্য শুধু অতীত স্মরণ করার জায়গা ছিল না; বরং নিজের গল্পের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ারও একটি উপায়। যে অভিজ্ঞতা একসময় তাঁকে নীরব করে রেখেছিল, সেটিই তিনি পরে প্রকাশ্যে আলোচনার বিষয় করেছেন।
‘ওয়েস্টল্যান্ড–এ ইভান র্যাচেল উড। আইএমডিবিব্যক্তিগত যন্ত্রণা থেকে আন্দোলনে
নিজের অভিজ্ঞতা তাঁকে আইন পরিবর্তনের আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত করে। ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ফিনিক্স অ্যাক্ট’-এর পক্ষে কাজ করেছেন ইভান। পারিবারিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
ইভানের যুক্তি ছিল, নির্যাতনের পরপরই প্রত্যেক ভুক্তভোগী আইনি লড়াইয়ে যেতে পারেন না। ভয়, মানসিক আঘাত, সামাজিক চাপ কিংবা অপরাধীর সঙ্গে ক্ষমতার অসম সম্পর্ক অনেককে বছরের পর বছর নীরব থাকতে বাধ্য করতে পারে।
সেখান থেকেই ইভানের লড়াই ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। একজন অভিনেত্রীর নিজের অভিজ্ঞতা পরিণত হয় বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে।
ডেডলাইন, আইএমডিবি ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে