ক্যান্ডি যেভাবে পেলাম

· Prothom Alo

১৬৭০ সাল। জার্মানির কোলোন গির্জায় চলছে বড়দিনের গম্ভীর প্রার্থনা। চারদিকে পিনপতন নীরবতা থাকার কথা। কিন্তু বাদ সাধল পেছনের সারিতে বসা একদল খুদে শ্রোতা। কোনোভাবেই তাদের শান্ত রাখা যাচ্ছে না। গির্জার গায়কদলের প্রধান তো মহা চিন্তায় পড়লেন। এই পিচ্চিগুলোর হাত থেকে বাঁচার উপায় কী? হঠাৎ তাঁর মাথায় একটা দারুণ বুদ্ধি এল।

Visit turconews.click for more information.

তিনি বাচ্চাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন সাদা রঙের লম্বাটে একধরনের শক্ত ক্যান্ডি। এগুলো চুষে খেতে এত সময় লাগে যে শিশুদের মুখ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়!

সে যুগে কিন্তু আজকের মতো মোড়ে মোড়ে ক্যান্ডির দোকান ছিল না। চিনি ছিল বেশ দামি ও দুর্লভ বস্তু। তাই বাচ্চাদের কাছে এই ক্যান্ডি পাওয়াটা ছিল রীতিমতো লটারির টিকিট পাওয়ার মতো আনন্দের ব্যাপার। তবে গির্জার ভেতরে সাধারণ ক্যান্ডি দেওয়াটা একটু বেমানান দেখাতে পারে ভেবে সেই গায়কদলের প্রধান ক্যান্ডিগুলোর মাথা একটু বাঁকিয়ে দিলেন। দেখতে ঠিক যেন যিশুর জন্মকথায় থাকা মেষপালকদের হাতের লাঠির মতো! ব্যস, জন্ম হলো আজকের দিনের আইকনিক ক্যান্ডি কেইন!

চকলেট খাওয়া বিড়ালের জন্য ক্ষতিকারক কেন

যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্ডির যাত্রা

প্রায় কয়েক শ বছর ধরে এই বাঁকানো ক্যান্ডিগুলো জার্মানির বড়দিনের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। ৬ জানুয়ারি এপিফ্যানি উৎসবের পর বাচ্চারা পরম আনন্দে ক্রিসমাস ট্রি থেকে পেড়ে এগুলো খেত। এপিফ্যানি খ্রিষ্টানদের একটি ধর্মীয় উৎসব। খ্রিষ্টান ধর্মানুসারীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে যিশুখ্রিষ্টের জন্মের পর তিন জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁকে দেখতে এসেছিলেন।

যাহোক, ১৮৪৭ সালে অগাস্ট ইমগার্ড নামে এক জার্মান-সুইডিশ অভিবাসী এই দারুণ ঐতিহ্যটি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন। ওহাইও অঙ্গরাজ্যের উস্টার শহরে নিজের ক্রিসমাস ট্রিতে তিনি এই ক্যান্ডি কেইনগুলো ঝুলিয়ে দেন। এরপরের গল্প তো ইতিহাস! খুব দ্রুতই এটি আমেরিকানদের উৎসব উদ্‌যাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।

চকলেট খেলে কি আসলেই দাঁতে পোকা হয়

লাল-সাদা ডোরাকাটা রহস্য

উনিশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত কিন্তু এই ক্যান্ডিগুলো দেখতে একদম ধবধবে সাদা ছিল। তাহলে এই যে লাল-সাদা ডোরাকাটা জাদুকরি ডিজাইন, এটা এল কোথা থেকে? ১৯২০-এর দশকে জর্জিয়ার আলবেনি শহরের বব ম্যাককরম্যাক নামে এক ক্যান্ডি প্রস্তুতকারক প্রথম এই ক্যান্ডির গায়ে লাল রঙের প্যাঁচানো নকশা তৈরি করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ক্যান্ডিগুলোকে দেখতে আরও উৎসবমুখর ও রঙিন করে তোলা।

এখানে অবশ্য একটা দারুণ কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, লাল-সাদা ডোরাকাটা দাগগুলো আসলে পবিত্র ট্রিনিটি এবং যিশুর আত্মত্যাগের প্রতীক। অলিভার ক্রমওয়েল যখন বড়দিন পালন নিষিদ্ধ করেছিলেন, তখন নাকি খ্রিষ্টানরা নিজেদের মধ্যে গোপনে যোগাযোগ করতে এই ক্যান্ডি ব্যবহার করত! তবে ম্যাককরম্যাকের ক্যান্ডি বানানোর পেছনে এমন কোনো গুরুগম্ভীর ধর্মীয় কারণ ছিল না। তিনি শুধু বড়দিনের আনন্দটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

যে চকলেট খেলে পাবে এই ৭ উপকার

পিপারমিন্ট থেকে বেকন ফ্লেভার

শুরুর দিকে ক্যান্ডি কেইনে চিনি ছাড়া আর কোনো ফ্লেভার ছিল না। শুধুই জমাট বাঁধা চিনির মিষ্টি স্বাদ! বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এতে যোগ হয় পেপারমিন্ট বা পুদিনার রিফ্রেশিং স্বাদ। আর এই স্বাদটা এত জনপ্রিয় হয় যে আজও এটি সবার পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। ব্রাচস ক্যান্ডি কোম্পানির ব্র্যান্ড ম্যানেজার লিজ স্মাইলির দেওয়া তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯ শতাংশ মানুষের কাছে আজও পেপারমিন্ট ফ্লেভারই সবচেয়ে প্রিয়। এরপরেই ১৮ শতাংশ জনপ্রিয়তা নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে চেরি এবং ব্লুবেরির ১৩ শতাংশ।

তবে এখনকার আধুনিক ক্যান্ডির দুনিয়া আর শুধু এই দুই-তিনটি স্বাদে আটকে নেই। মিষ্টি স্বাদের পাশাপাশি এখন টক আপেল, ঝাল দারুচিনি, বার্থডে কেক, এমনকি আচার ও বেকন ফ্লেভারের ক্যান্ডি কেইনও পাওয়া যায়! তুমি কি মাংস বা আচারের স্বাদের কোনো লজেন্স চেখে দেখতে চাইবে?

আধুনিক যুগের ক্যান্ডি কেইন

প্যাকেজিং আর ডিজাইনেও এখন এসেছে বিশাল পরিবর্তন। রংধনু রঙের নকশা, গ্লিটার দেওয়া চকচকে আবরণ, কিংবা জনপ্রিয় সুপারহিরো আঁকা প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়া ক্যান্ডি কেইন এখন সুপারশপের তাক আলো করে রাখে। ক্রিসমাস ট্রি সাজানোর জন্য দানবাকৃতির ক্যান্ডি যেমন আছে, তেমনি পকেটে নিয়ে ঘোরার জন্য আছে মিনি সাইজের ক্যান্ডিও। বেকিংয়ের জন্য গুঁড়া করা ক্যান্ডি থেকে শুরু করে অন্য লজেন্সে ঠাসা প্লাস্টিকের ক্যান্ডি কেইন—কী নেই এখন!

সেই ১৬৭০ সালের চার্চের শান্তশিষ্ট সাদা লজেন্সটা আজ রীতিমতো পপ কালচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। পেপারমিন্টের ক্ল্যাসিক স্বাদ হোক বা নতুন যুগের উদ্ভট বেকন ফ্লেভার, উৎসবের সকালে এই ক্যান্ডির মোড়ক খোলার আনন্দটা আজও সেই আগের মতো অমলিন রয়ে গেছে।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

চকলেটের ইতিহাস: চকলেট পেলাম কীভাবে

Read full story at source