কানকাটা ভ্যান গঘ

· Prothom Alo

আমার ঘরে ১১টা কান আছে।

কাচের বয়ামে, সারি করে, জানালার তাকে, যেখানে সকালের রোদ পড়ে। ১১টাই বাঁ কান। কেন বাঁ কান, সেটা আপনি গল্পের মাঝামাঝি গেলে বুঝবেন। আর কেন সংখ্যাটা ১১–তে থেমে আছে, সেটা বুঝবেন শেষে গিয়ে। যদি শেষ পর্যন্ত যেতে পারেন। অনেকে পারে না। আমার গল্পটা আরামের নয়।

Visit michezonews.co.za for more information.

আগে নিজের পরিচয়টা দিই। আমি ছবি আঁকি, ২৩ বছর ধরে। চারুকলার ডিগ্রি আছে, দুইটা গ্রুপ এক্সিবিশনের সার্টিফিকেট আছে, আর আছে একটা ঘরভর্তি না-বেচা ক্যানভাস। ২৩ বছরে আমি বিক্রি করেছি একটা ছবি—সাত হাজার টাকায়, এক এনজিওর অফিসের দেয়ালের জন্য, যেখানে ওটা এখন এসির পানির দাগের নিচে ঝুলছে।

হাসবেন না। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘও জীবনে একটাই ছবি বেচেছিলেন—‘লাল আঙুরখেত’। ৪০০ ফ্রাঁ। লোকটা আট শতাধিক ছবি এঁকে গেছেন, আর দুনিয়া তাঁকে জ্যান্ত অবস্থায় একটার দাম দিয়েছে। মরার পরে সেই দুনিয়াই তাঁর ‘সূর্যমুখী’ কিনেছে ৯৪ মিলিয়ন ডলারে। এখন তাঁর ‘স্টারি নাইট’ পেইন্টিং ছাপা হয় মগে, টি–শার্টে, মোবাইলের কভারে, ক্যাফের দেয়ালে। যেই দুনিয়া মানুষটাকে এক বেলা ভাত দেয়নি, সেই দুনিয়া এখন তাঁর যন্ত্রণা ছাপা মগে কফি খায়, ছবি তুলে ক্যাপশন দেয় গভীর দার্শনিক কিছু।

দুনিয়া আসলের দাম দেয় মরার পরে। আর নকল বা সস্তা জিনিসের দাম দেয় নগদে। এই এক লাইনেই আমার ২৩ বছরের হিসাব শেষ।

ভ্যান গঘের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ভক্তির নয়, আত্মীয়তার। মানুষটার জীবনী আমি মুখস্থ বলতে পারি। আর্লের হলুদ বাড়ি, যেখানে উনি স্বপ্ন দেখেছিলেন শিল্পীদের একটা সংসার হবে। গঘ্যাঁর সঙ্গে দুই মাসের সেই রোজ তর্ক, রোজ বন্ধুত্ব, রোজ ভাঙন। তারপর ১৮৮৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাত। গঘ্যাঁ চলে যাবেন শুনে মানুষটার মাথায় কী যেন ছিঁড়ে গেল, আর উনি খুর হাতে নিজের বাঁ কানটা ছিন্ন করে আনলেন। মনের বিষণ্নতা কান কেটে ফেলার যন্ত্রণাকেও হার মানাল। কানটা উনি কাগজে মুড়ে এক মেয়ের হাতে দিয়ে এসেছিলেন, যত্ন করে, উপহারের মতো। ‘এই জিনিসটা রেখো।’

সবাই এই গল্প বলে পাগলামির প্রমাণ হিসেবে। আমি ২৩ বছর ধরে অন্য একটা জিনিস ভেবেছি। মানুষটা কানটাই–বা কাটলেন কেন? আঙুল না, হাত না—কান!

উত্তরটা আমি পেয়েছি।

মানুষের সব ইন্দ্রিয়ের দরজায় পাহারা আছে। চোখের পাতা আছে, বন্ধ করা যায়। মুখ বন্ধ করা যায়, নিশ্বাস না নিয়ে কিছুক্ষণ থাকা যায়। খালি কানের কোনো ঢাকনা নেই। কান হলো সেই দরজা, যেটা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত খোলা। যা আসে, ঢোকে। ঘুমের মধ্যেও ঢোকে। আর যা ঢোকে, জমা হয়। কান আসলে শোনার যন্ত্র নয়। কান হলো স্মৃতির গুদামঘর। মানুষ সারা জীবনে যা শুনেছে, সব ওই দুইটা প্যাঁচানো খোলের ভেতরে স্তরে স্তরে জমা। প্রিয় মানুষের ডাক, মায়ের ঘুমপাড়ানি, অপমানের বাক্য, প্রিয়-অপ্রিয় গান, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল—সব। আগে মানুষ ঠিক করত কী শুনবে। এখন অ্যালগরিদম মেশিন ঠিক করে।

ভ্যান গঘ যন্ত্রণায় পাগল হয়ে গুদামঘরটাই ফেলে দিতে চেয়েছিলেন। ভুল গুদাম বেছেছিলেন অবশ্য। সে অন্য আলাপ।

এবার আমার শহরের কথা বলি। আর সেই ডিসেম্বরের কথা।

গত বছর ২৩ ডিসেম্বর আমি ঠিক করেছিলাম, আমার শেষ শিল্পকর্মটা করব—ক্যানভাসে নয়। নিজের ওপর। ভ্যান গঘের মৃত্যুদিন নয়, কান কাটার রাতটাই আমার কাছে আসল তারিখ, কারণ ওই রাতেই শিল্পী আর দুনিয়ার মধ্যে বাঁধনের গিট্টুটা ছিঁড়ে গিয়েছিল চিরদিনের জন্য। আমি ঠিক করেছিলাম, ওই রাতে আমি আমার বাঁ কানটা কাটব, প্রতিবাদ হিসেবে। পারফরম্যান্স আর্ট। যে শহর ২৩ বছরে আমার একটা ছবির দিকে দুই মিনিট তাকায়নি, সেই শহর অন্তত একটা কাটা কানের দিকে তাকাবে। কারণ, পুরো ব্যাপার ঘটবে ফেসবুক লাইভে। ধারালো খুর কেনা হয়ে গিয়েছিল। আয়নার সামনে চেয়ার পাতা হয়েছিল।

তারপর খুরটা যখন কানের কাছে, ঠিক তখন, দেয়ালের ওপাশ থেকে শব্দটা এল।

পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটা রিল বানায়। সারা দিন। একই ১৫ সেকেন্ডের গান, একই ভাইরাল অডিও, ঘুরে ঘুরে, দিনে ৪০–৫০ বার। ওই মুহূর্তে, আমার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র মুহূর্তে, দেয়াল ভেদ করে ঢুকল সেই অডিওটা, সেদিনের ৪৭

নম্বর বার।

আর আমার হাতটা থেমে গেল। খুর নামিয়ে আমি অনেকক্ষণ আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর হাসলাম। কারণ, আমি ভুলটা ধরে ফেলেছি।

আমি ভুল কান কাটতে বসেছিলাম।

বিশ্বাস করেন, আমি ন্যায়বিচারক। প্রতিটি কান আমি রাতের পর রাত শুনেছি, খুঁজেছি, আসল কিছু পাই কি না। এক নম্বর বয়াম, রিল বানানো ইনফ্লুয়েন্সার মেয়েটা। ওর কানে তিন হাজার বার একই ভাইরাল গানের মিউজিক, ৩৩টা রিংটোনের মতো সুর, আর অন্যের শিল্প চুরি। এরপরে সাহিত্য পেজ চালানো মেয়েটা, যে ইংরেজি লেখা বাংলা করে নিজের নামে ছাপে। ওর কানে খালি নোটিফিকেশনের টুংটাং, হাজারে হাজারে, শিলাবৃষ্টির মতো।

আমার কান তো নিরপরাধ। আমার কান ২৩ বছর ধরে রঙের নাম শুনেছে, রবীন্দ্রসংগীত শুনেছে, বিটলস শুনেছে, পিংক ফ্লয়েড শুনেছে, বৃষ্টি শুনেছে। অপরাধী তো তাদের কান, যারা ওই খোলা দরজা দিয়ে বছরের পর বছর শুধু বাতিল সস্তা জিনিস ঢুকিয়েছে। ধার করা গান, ধার করা মতবাদ, ধার করা মেকি হাসি-কান্না, অন্যের বানানো ১৫ সেকেন্ডের অর্থহীন সংলাপ। যাদের গুদামে নিজের বলতে একটা শব্দও নেই, কান জিনিসটা ওদের কাছে অপচয়। আর অপচয়ের জিনিস কেড়ে নেওয়াকে চুরি বলে না, বলে উদ্ধার।

সেই রাতে আমি খুরটা ধুয়ে তুলে রাখলাম, নিজের জন্য নয়।

কান কীভাবে নিই, সেই প্রশ্নটা করবেন না। শিল্পীর টেকনিক শিল্পীর সম্পদ। এটুকু জানেন, আমার হাত সার্জনের চেয়ে স্থির, কারণ আমি ২৩ বছর শূন্য দশমিক ৩ মিলিমিটারের তুলি টেনেছি। আর এটুকু জানেন, ওরা কেউ মরে নাই, একজনও না। আমি কসাই নই, আমি সংগ্রাহক। মিউজিয়াম মমি রাখে, আমি রাখি কান। শহরে এখন ১১ জন মানুষ চুল লম্বা রেখে ঘোরে, বাঁ দিকটা ঢেকে। পুলিশ বলে কানকাটা চক্র, পত্রিকা নাম দিয়েছে কানকাটা ভ্যান গঘ। মূর্খের দল। ওরা ভাবছে আমি কান কেনাবেচা করি।

প্রতিটি কাজ আমি করেছি শিল্পীর নিয়মে। তাড়াহুড়া নাই, রাগ নাই, একটা অতিরিক্ত আঁচড় নাই। কসাইয়ের সঙ্গে শিল্পীর পার্থক্য জানেন? কসাই শুধু মাংস কাটার কাজ শেষ করে। শিল্পী কাজ সম্পূর্ণ করে।

আগে আসত প্রস্তুতি। যাকে নেব, তাকে আমি আগে শুনতাম, সপ্তাহের পর সপ্তাহ। তার রুটিন, তার মোবাইলে কী বাজে, তার কণ্ঠে কার কথা। ক্যানভাস না চিনে কেউ তুলি ধরে না। তারপর সেই রাতে, কাজের আগে, আমি তাদের ঘুমটা নিশ্চিত করতাম।

কিন্তু ব্যথা একেবারে না দিলে তো ঠকানো হয়। সত্য আর্ট ব্যথা ছাড়া হয় না, এই শিক্ষাটাই তো দিতে বের হয়েছি। তাই ব্যথাটুকু আমি দিতাম মেপে, আমার নিজস্ব সিগনেচার টাচে। ২৩ বছরে একটা গ্যালারি আমাকে দেয়াল দেয় নাই। আমি নিজের গ্যালারি নিজে বানিয়ে নিয়েছি।

তারপর কাজ শেষে ধোয়ামোছা, ওষুধ, ব্যান্ডেজ—সব নিয়মমতো। আমার একটা ক্যানভাসেও ইনফেকশন হয় নাই, এই রেকর্ড যেকোনো সার্জারি ওয়ার্ডের চেয়ে ভালো এবং সবার শেষে, যাওয়ার আগে আমার গুরু ভ্যান গঘের চিত্রকর্ম। যেখানে কানটা ছিল, সেই জায়গাটার চারপাশের চামড়ায় আমি এঁকে দিয়ে আসতাম একটা ছোট্ট ঘূর্ণি—তারাভরা রাতের সেই পাক খাওয়া আকাশ, দুই ইঞ্চিতে। ভ্যান গঘ সব ছবিতে সই করতেন না, জানেন তো। যে কাজটাকে উনি সম্পূর্ণ মনে করতেন, খালি সেইটাতে লিখতেন, ভিনসেন্ট। পদবি নয়, খালি নামটা। আমিও তা–ই। প্রতিটি কানের লতিতে, এত মিহি করে যে আতশি কাচ লাগে পড়তে, আমি লিখে দিতাম একটাই শব্দ—ভিনসেন্ট।

এখানে এসে আপনি হয়তো আমাকে পাগল ভাববেন। ভাবেন, ক্ষতি নাই। ভ্যান গঘকেও

সবাই ভাবত।

আর হ্যাঁ, আমার বাছাইয়ের একটা নীতি ছিল। শক্ত নীতি। রিকশাওয়ালা ছেলে যখন ভাইরাল গানে ঠোঁট মেলায়, ওইটা তার একমাত্র বিনোদন। গার্মেন্টসের মেয়ে যখন নকল ডিজাইন তোলে, ওইটা তার ভাত। পেটের দায়ের নকল আমার আদালতে মাফ। ওইটা অপরাধ নয়, বেঁচে থাকার লড়াই। বেশির ভাগ মানুষের কাছেই আজকাল নকল আরামের, আসল লাগে ব্যথার। মানুষ আরামটা বেছে নেয়, তারপর সারা জীবন

ব্যথায় থাকে।

আমার লিস্টে উঠত অন্যরা। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা, যারা ঠিক ভ্যান গঘের ছেড়ে যাওয়া বন্ধুর মতো। ব্যাংকের ম্যানেজারের কন্যা, যে বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে এসে অন্যের কবিতা, ছবি, ভিডিও নকল করে তার সঙ্গে নেচে নিজের পেজে পোস্ট করে। শিল্পপতির বউ, যে এআই দিয়ে আর্ট বানিয়ে গ্যালারি ভাড়া করে একক প্রদর্শনী করে, উদ্বোধনে মন্ত্রী আসে।

দুনিয়ার সব দরজা খোলা পেয়েও এরা নিজের একটা শিল্প বানায়নি। তাই আমার খুর কোনো দিন ক্ষুধার্ত কান ছোঁয় নাই। আমি খালি শিকার করতাম সচ্ছল কান।

কাটা কান ফরমালিনে রাখলে সে মরে না। সে বাজে। রাত দুইটার পরে, ঘর যখন নিস্তব্ধ, বয়ামগুলো চালু হয়। প্রতিটি কান তার গুদামের মাল ফেরত দেয়, স্তরের পর স্তর, যা যা সে জীবনে জমিয়েছে, বেশির ভাগ বাজে বস্তাপচা জিনিস। সবারই ছোটবেলার সময়গুলোর গল্পে সত্য আর্ট ছিল। আমি চেয়ার টেনে বসি, চোখ বন্ধ করি, আর কানের গল্প শুনি। ১১টা কান, ১১টা পডকাস্টের মতন।

বিশ্বাস করেন, আমি ন্যায়বিচারক। প্রতিটি কান আমি রাতের পর রাত শুনেছি, খুঁজেছি, আসল কিছু পাই কি না। এক নম্বর বয়াম, রিল বানানো ইনফ্লুয়েন্সার মেয়েটা। ওর কানে তিন হাজার বার একই ভাইরাল গানের মিউজিক, ৩৩টা রিংটোনের মতো সুর, আর অন্যের শিল্প চুরি।

এরপরে সাহিত্য পেজ চালানো মেয়েটা, যে ইংরেজি লেখা বাংলা করে নিজের নামে ছাপে। ওর কানে খালি নোটিফিকেশনের টুংটাং, হাজারে হাজারে, শিলাবৃষ্টির মতো।

নকল, নকল, নকল। ১১টা গুদামে একটা আসল শব্দ নাই। কখনো নকল গান, কখনো নাচ, কখনো সস্তা কৌতুক, অভিনয় আর লাইফস্টাইল ভ্লগ।

লাইভটা ফেসবুক মুছেছে ৫৪ মিনিটের মাথায়। ততক্ষণে স্ক্রিন রেকর্ড টেলিগ্রামে, হোয়াটসঅ্যাপে, রিঅ্যাকশন ভিডিওতে। ফজরের আজান পড়ার আগেই আমার নামে তিনটা ফ্যানপেজ, কানকাটা ভ্যান গঘ। সকাল ১০টায় হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং, দুপুরে টক শোতে দুই বুদ্ধিজীবী ঝগড়া করছেন আমি সাইকোপ্যাথ না প্রতিবাদী শিল্পী। বিকেলে এক অনলাইন মিডিয়ার শিরোনাম, ‘নকলের যুগের ডিজিটাল গুরু’। ২৩ বছর গ্যালারিতে দেড় শ দর্শক পাই নাই। এক রাতে আমার মুরিদ হয়ে গেল একটা প্রজন্ম, যারা আমার একটা ছবিও দেখে নাই।

১১ নম্বরের রাতটার কথা বলি। অভিনেতা, নির্মাতা, সিঙ্গার, মিউজিশিয়ান, ইনফ্লুয়েন্সার আর মার্কেটিয়ার। একের ভেতর সব। কিন্তু সব আর্টেই তাঁর ভেজাল। কান থাকার কোনো যোগ্যতাই নেই। তাঁর উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ভিডিওগুলোর সুবাদে নামকরা এক কনডম কোম্পানি তাঁকে মুখপাত্র বানিয়েছে। গুলশানের ১১ তলা, দুইটা সিকিউরিটি গেট, ফেশিয়াল রিকগনিশন লক। ধনী মানুষ ভাবে নিরাপত্তা কেনা যায়। কেনা যায় ঠিকই, খালি বিক্রেতা সব সময় সৎ নয়। ছেলেটার ঘুম ভাঙল রাত দুইটা ১৭–তে এবং সে দেখল, তার শোবার ঘরটা আর চেনা ঘর নেই। কোনায় একটা হলুদ বাতি জ্বলছে, যেটা তার নয়। দেয়ালে প্রজেক্টরে চলছে তাঁর নিজের ভেরিফায়েড পেজের রগরগে কনটেন্ট, স্ক্রল হচ্ছে আপনাআপনি, পোস্টের পর পোস্ট। ট্রাইপডে একটা ফোন দাঁড়ানো, লাল বিন্দুটা জ্বলছে। আর তার সামনে চেয়ারে পা তুলে আরাম করে আমি। মেহমানের ভঙ্গিতে। সে চিৎকার দিতে মুখ খুলল, আমি আঙুল তুললাম না, চুপ করতেও বলি নাই। খালি বললাম, ‘দাও। চিৎকার দাও। শোনো, ৬৩ হাজার মানুষ লাইভ দেখতেছে এ মুহূর্তে। এর মধ্যে চাইরজন রিপোর্ট করছে, বাকিরা শেয়ার দিতেছে। কেউ আসতেছে না। চিৎকারে কাজ হইলে এই শহরে এত দিনে অনেক কিছু বদলাইত।’

ছেলেটা চিৎকার দিল না। মানুষ চিৎকার দেয় আশা থাকলে। সে ফিসফিস করে বলল, ‘টাকা লাগবে? যা চান।’

আমি বললাম, ‘আছে সব। খালি একটা জিনিস চাই। তোমার পেজের যেকোনো একটা যে গানটা গাইছ, সেটা খালি গলায় গেয়ে শোনাও।’

সে শোনাল, কাঁপা গলায়, নিজের পেজের সবচেয়ে ভাইরাল গানটা, যার মিউজিক ভিডিওতে ১৮+ সতর্কবার্তা দেওয়া উচিত ছিল। আমি বললাম, ‘ভালোই তো গাও, এইবার সত্যিই নিজের লেখা একটা লাইন—যেকোনো একটা। একটা সত্য নিজের বানানো লাইন শোনাইলেই আমি উইঠা চইলা যামু, আল্লার কসম।’

তারপর, আপনারা বিশ্বাস করেন আর না করেন, আমি সাড়ে তিন মিনিট অপেক্ষা করেছি। ঘড়ি ধরে। ৬৩ হাজার মানুষও করেছে। কমেন্ট থেমে গিয়েছিল, ভাবা যায়? ফেসবুক চুপ। সাড়ে তিন মিনিটে সাত বছরের ট্যালেন্ট ক্রিয়েটিভ নির্মাতা নিজের একটা লাইন বানাতে পারল না। ওই নীরবতাটাই রায়, আমি খালি কার্যকর করেছি। কীভাবে, জিজ্ঞেস করবেন না। বলেছি তো, ফ্রেমের বাইরে। ক্যামেরা দেখেছে খালি দেয়ালে তার স্ক্রল হতে থাকা চুরির খাতা, আর শুনেছে আমার তাল, চার মিনিট, হলুদ আলোয়। ও ব্যথা পেয়েছে স্বপ্নের ভেতর দিয়ে, জেগে ওঠার আগেই ব্যান্ডেজ, ওষুধ, গজের ওপর ছোট্ট সূর্যমুখী। যাওয়ার আগে আমি ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে প্রথমবার কথা বলেছিলাম দর্শকদের সঙ্গে, মুখ অন্ধকারে রেখে। বলেছিলাম, ‘আপনারা ভাবতেছেন আমি ওর কান নিছি। উল্টা। ও সাত বছর ধইরা আপনাদের কান নিতেছিল। আমি খালি চুরির মালটা উদ্ধার করলাম। ওর ভিডিও দেখে হুকআপ কালচার এত কুল মনে করে সবাই, ভালোবাসার দাম আর নাই এ প্রজন্মের কাছে। কেউ একটা প্রেমের কবিতা লেখে না, গান গায় না, সবাই রিলস পাঠায়, মিম পাঠায় একে অন্যকে। ও সমাজের জন্য ক্যানসার।’

লাইভটা ফেসবুক মুছেছে ৫৪ মিনিটের মাথায়। ততক্ষণে স্ক্রিন রেকর্ড টেলিগ্রামে, হোয়াটসঅ্যাপে, রিঅ্যাকশন ভিডিওতে। ফজরের আজান পড়ার আগেই আমার নামে তিনটা ফ্যানপেজ, কানকাটা ভ্যান গঘ। সকাল ১০টায় হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং, দুপুরে টক শোতে দুই বুদ্ধিজীবী ঝগড়া করছেন আমি সাইকোপ্যাথ না প্রতিবাদী শিল্পী। বিকেলে এক অনলাইন মিডিয়ার শিরোনাম, ‘নকলের যুগের ডিজিটাল গুরু’। ২৩ বছর গ্যালারিতে দেড় শ দর্শক পাই নাই। এক রাতে আমার মুরিদ হয়ে গেল একটা প্রজন্ম, যারা আমার একটা ছবিও দেখে নাই। তা–ও এআই দিয়ে এক বাংলাদেশি চেহারা আর রঙের কানকাটা ভ্যান গঘের ছবি জেনারেট করে সবাই প্রোফাইল ছবি দিতে থাকল। এবং এই জায়গাটায় এসে আমি প্রথমবার টের পেয়েছিলাম, আমার হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কারণ, ভক্তরা কেউ আমার শিল্প ভালোবাসে নাই। ওরা ভালোবাসছিল তামাশা। আমি নকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলাম, আর আমার সেনাবাহিনী হয়ে দাঁড়াল তারা, যাদের কান আমার জব্দ করার কথা। শিল্পী চাইছিল শ্রোতা, ভক্তি। পেল সার্কাসের দর্শক। দুটো যে এক জিনিস না, ওই সকালে আমার চেয়ে ভালো কেউ জানত না।

আমার রায় ঠিক ছিল। আমি ঘুমাতে যেতাম শান্তিতে—যে শান্তি বিচারকের; জল্লাদের না। ব্যাপারটা নিয়ে মনের খচখচানি গেল না।

আরেকজনের বয়ামে, নোটিফিকেশনের শিলাবৃষ্টির তলায়, ফজরের আগের অন্ধকারে একটা ফিসফিসে মোনাজাত, মায়ের অসুখ নিয়ে, ভাইয়ের চাকরি নিয়ে। আসল ছিল। সবগুলোতে ছিল। বুঝলাম মানুষের গুদাম কখনো পুরো নকলে ভরে না। কোথাও না কোথাও এক কোনায় প্রতিটা মানুষ নিজের একটা সুর লুকিয়ে রাখে। আমি ওপরের তাকের ময়লা দেখে গুদাম সিলগালা করে দিয়েছি, ১২ বার।

তারপর এল ১২ নম্বর।

চারুকলার মেয়েটা, যে বিখ্যাত ছবি ট্রেস করে হাতে আঁকা বলে অনলাইনে বেচে। ওর কানে ইউটিউব টিউটোরিয়ালের আমেরিকান গলা, হাউ টু পেইন্ট লাইক ভ্যান গঘ ইন টেন মিনিটস। ১০ মিনিট! মানুষটার লেগেছিল ১০ বছর আর একটা কান। মেয়েটাকে আমি দেখতাম এক ফেসবুক পেজে। রংতুলি আর প্যাস্টেল দিয়ে ও ছবি আঁকত, পয়সার জন্য। কী আঁকত? মোনালিসা। তারাভরা রাত। সূর্যমুখী। দিনের পর দিন, একই বিখ্যাত ছবি, পর্যটকদের জন্য, টাকার বাকসো পাশে রেখে। আমার চোখে ও ছিল নকলের রানি। ভ্যান গঘের যন্ত্রণা রংতুলি দিয়ে ঘষে নকল করে ও রোজগার করত। আর ফেসবুকে এসে কানকাটা ভ্যান গঘকে মস্তিষ্ক বিকৃত মানুষ বলে স্ট্যাটাস দিত।

ওরটা আমি নিয়েছি সবচেয়ে যত্নে, কাগজে মুড়ে, যেভাবে উনি মুড়েছিলেন, উপহারের মতো।

১২ নম্বর বয়াম তাকে উঠল রাত দুইটায়। আমি চেয়ার টানলাম। চোখ বন্ধ করলাম।

আর আমার দুনিয়াটা ভেঙে গেল।

১২ নম্বর কান রিংটোন বাজাল না। ভাইরাল অডিও বাজাল না। ১২ নম্বর কান বাজাল একটা সুর। গুনগুন, খালি গলা, মেয়েলি, ক্লান্ত। সুরটা আমি চিনি না। কোনো সিনেমার না, কোনো ব্যান্ডের না, কোনো যুগের না। আমি সারা জীবন গান শুনেছি, আমার কানের গুদাম আমি চিনি। এই সুর পৃথিবীর কোনো গুদামে নাই।

এই সুর কেউ বানিয়েছে।

আমি তিন রাত ঘুমাইনি। চতুর্থ দিনে গেলাম হাসপাতালে, যেখানে মেয়েটা ভর্তি ছিল। আর কানে ছিল স্টারি নাইটের ঘূর্ণি। সরাসরি যাইনি, আমি অত বোকা না। ওর পাশের বেডের রোগীর লোকজনের সাথে ভাব করলাম, ফল নিয়ে গেলাম। যা জানলাম, সেটা আমি আপনাকে যেভাবে শুনেছি, সেভাবেই বলি।

মেয়েটার সাত বছরের বাচ্চা ক্যানসারের রোগী, ওই হাসপাতালেরই ছয়তলায়, সাত মাস ধরে। ফেসবুকে আর্ট ভিডিও করে আর আর্ট বিক্রি করে যা ওঠে, তার একেবারে পুরোটা যায় চিকিৎসায়। আর মেয়েটা প্রতি রাতে তার ছেলের বেডের পাশে বসে একটা ঘুমপাড়ানি গান গায়। নিজের বানানো। বাচ্চাটার নাকি কোনো কিছুতেই ঘুম আসে না, খালি ওর মায়ের সুরটায় আসে।

সেই সুর। ১২ নম্বর বয়ামের সুর।

আমি হাসপাতালের সিঁড়িতে বসে পড়েছিলাম। হিসাবটা তখন আমার সামনে দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে। মেয়েটা দিনের বেলা নকল পেইন্টিং বেচত পেটের জন্য, আর রাতের বেলা বিশুদ্ধ সুন্দর সুরে গাইত সন্তানের জন্য। নকল করে আঁকাটা ছিল ওর পেশা, বেঁচে থাকার লড়াই। আসলটা ছিল ওর প্রার্থনা।

সেই রাতে ফিরে আমি বাকি ১১টা বয়াম আবার শুনলাম। এবার অন্যভাবে। এবার আরও গভীরভাবে কান পাতলাম, স্তরের নিচের স্তরে, আর নতুন কিছু শুনতে পেলাম।

১ নম্বর বয়ামে, তিন হাজার ভাইরাল ভিডিওর নিচে, একটা ১৬ বছরের গলা আয়নার সামনে নিজেকে বলছে, তুই পারবি, ওরা যা-ই বলুক, তুই পারবি। নিজের বানানো বাক্য, নিজের গলায়, রোজ সকালে। কিন্তু জীবন তাকে হতাশই করেছে।

আরেক বয়ামে, ভাইরাল কথা গানের নিচে, একটা মেয়ে ফোনে ছোট ভাইকে অঙ্ক বোঝাচ্ছে নিজের বানানো উদাহরণে, আর ভাইটা হাসছে।

আরেকজনের বয়ামে, নোটিফিকেশনের শিলাবৃষ্টির তলায়, ফজরের আগের অন্ধকারে একটা ফিসফিসে মোনাজাত, মায়ের অসুখ নিয়ে, ভাইয়ের চাকরি নিয়ে।

আসল ছিল। সবগুলোতে ছিল। বুঝলাম মানুষের গুদাম কখনো পুরো নকলে ভরে না। কোথাও না কোথাও এক কোনায় প্রতিটা মানুষ নিজের একটা সুর লুকিয়ে রাখে। আমি ওপরের তাকের ময়লা দেখে গুদাম সিলগালা করে দিয়েছি, ১২ বার।

হাতটা উঠছে। আমি বাধা দিচ্ছি না। আবার চালাচ্ছিও না। ভ্যান গঘ আর আমি, দুজন আয়নার দুই পাশে বসে আছি। মাঝখানে একটা খুর। আর সিদ্ধান্তটা ঝুলে আছে আমাদের দুজনের কারও হাতে না, সম্ভবত আপনার হাতে, কারণ আপনি এখনো পড়ছেন। এখন সময় সেই প্রশ্নের।

শ্রোতা? আমি? আমি ছিলাম সেই সমালোচক, যে বইয়ের মলাট দেখে লেখকের ফাঁসি দেয়।

আর তারপর এল শেষ ধাক্কাটা। সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে নির্মম ধাক্কা।

আমি বেসিনে মুখ ধুতে গিয়ে আয়নায় তাকালাম। এবং এই প্রথম, ২৩ বছরে এই প্রথম, লোকটাকে দেখলাম।

লালচে দাড়ি, ছাঁটা ভ্যান গঘের মতো। মাথায় খড়ের হ্যাট, আর্লের রোদের জন্য বানানো, ঢাকার ডিসেম্বরে। দেয়ালে সূর্যমুখীর প্রিন্ট, তারাভরা রাতের প্রিন্ট, হলুদ রং করা একটা ঘর, ক্যালেন্ডারে তেইশে ডিসেম্বর লাল কালিতে গোল করা। একটা লোক, যে আরেকটা মানুষের দাড়ি, টুপি, ঘর, যন্ত্রণা, এমনকি খুরের তারিখ পর্যন্ত টুকে টুকে নিজের জীবন বানিয়েছে। এবং সেই লোক শহরের মানুষের কান কেটে বেড়াচ্ছে। তাদের অপরাধ, তারা নকল।

শহরের সবচেয়ে বড় নকলটা ১২টা বয়ামের মালিক।

আজ তেইশে ডিসেম্বর। ঠিক এক বছর পর আমি আবার আয়নার সামনে বসে আছি। আর খুরটা আবার আমার হাতে। এবার কার কান, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।

১২ নম্বর বয়ামটা আমি হাসপাতালের গেটে রেখে এসেছি ভোরে, কাগজে মুড়ে, মেয়েটার নামে—যা যার আমানত। বাকি ১১টা ফেরত দেওয়ার রাস্তা খুঁজছি।

বয়াম ফেরত দিয়েছি, তাতে আমার লাভ হয়নি, কারণ তাদের কথাগুলো এখন আমার গুদামে ঢুকে গেছে। আমার কানে। দিনরাত বাজছে, আর তার তলায় আমার ২৩ বছরের সব দম্ভ পুড়ে ছাই হচ্ছে। ভ্যান গঘ কেন কান কেটেছিলেন, আমি এখন হাড়ে হাড়ে জানি। মানুষ কান কাটে ভেতরের শব্দ থামাতে। আর আমি এটাও জানি, ওনারটা থামেনি। কাটা কানে উনি আরও দেড় বছর ওই শব্দ শুনেছেন, তারপর গমখেতে গিয়ে…

খুরটা হাতে নিয়ে বসে আছি অনেকক্ষণ। জানালার বাইরে ডিসেম্বরের কুয়াশা। ১২টা খালি বয়াম ধোয়া হয়ে ওলটানো আছে তাকে, শুকাচ্ছে।

কানটা কাটলে কি সুরটা থামবে? ভ্যান গঘেরটা থামেনি। নাকি এই সুরটার থামার দরকার নাই, এই সুরটাই আমার সাজা, আমার ২৩ বছরে শোনা একমাত্র আসল জিনিস, যেটা আমি চুরি করে এনেছি একটা মেয়ের থেকে, যে মেয়ে ওটা বানিয়েছিল তার মরণাপন্ন শিশুর এক রাতের ঘুমের জন্য?

হাতটা উঠছে। আমি বাধা দিচ্ছি না। আবার চালাচ্ছিও না। ভ্যান গঘ আর আমি, দুজন আয়নার দুই পাশে বসে আছি। মাঝখানে একটা খুর। আর সিদ্ধান্তটা ঝুলে আছে আমাদের দুজনের কারও হাতে না, সম্ভবত আপনার হাতে, কারণ আপনি এখনো পড়ছেন। এখন সময় সেই প্রশ্নের।

এক. আজ সারা দিন আপনার কানের খোলা দরজা দিয়ে যা যা ঢুকেছে, হিসাব করেন তো, তার কয়টা শব্দ আপনার জন্য বানানো, আর কয়টা স্রেফ ইউজলেস, এত কিছুর আড়ালে চাপা পড়ে থাকা আপনার নিজের শব্দটা, নিজের আসল সুরটা, শেষ কবে শুনেছেন? মনে পড়ছে না? বেশির ভাগ মানুষ মরে যায় সেই সুরটা একবারও না বাজিয়ে।

তাহলে দ্বিতীয় প্রশ্ন: কান নামক গুদামটা তাহলে রেখেছেন কিসের জন্য?

শহরে শ্রোতা আমি একলা না।

Read full story at source