প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে ‘বন ভয়াজ’: এক টেবিলে বিশ্বের স্বাদ

· Prothom Alo

বিশ্ব পর্যটন দিবস সামনে রেখে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও ঢাকায় এমনই এক স্বাদভ্রমণের আয়োজন করেছে। ‘বন ভয়াজ: আ টেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের বিশেষ ডিনার বুফেতে একই ছাদের নিচে জায়গা পেয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খাবার ও রান্নার ঐতিহ্য।

Visit sportbet.reviews for more information.

ভ্রমণ মানেই সব সময় বিমানে চড়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে যাওয়া নয়। কখনো কখনো কোনো খাবারের স্বাদও আমাদের নিয়ে যেতে পারে বহু দূরের কোনো দেশ, তার মানুষ, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের কাছে। কোনো রেস্তোরাঁর টেবিলে বসে ইতালির পাস্তা, ইরানের কাবাব, জাপানের ইয়াকিতোরি কিংবা মেক্সিকোর ভিন্ন স্বাদের খাবার চেখে দেখার অভিজ্ঞতাও তাই একধরনের ভ্রমণ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা

আর এই আবহ উপভোগ করা যায় প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও ঢাকার চলমান আয়োজনে। যেখানে ইতালি, ফ্রান্স, জাপান, চীন, মেক্সিকো, স্পেন, ভারত, ইরান, বাংলাদেশ, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের খাবার সাজানো হয়েছে আলাদা আলাদা স্টেশনে। ফলে পুরো আয়োজনকে শুধু বুফে বললে কিছুটা কম বলা হয়। খাবারের স্টেশন ধরে এগোতে এগোতে মনে হয়, এক সন্ধ্যায়ই যেন কয়েকটি দেশের রান্নাঘরে ঘুরে আসা হচ্ছে।
‘বন ভয়াজ: আ টেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের এ উৎসব শুরু হয়েছে ১৬ সেপ্টেম্বর। হোটেলের ক্যাফে বাজার রেস্তোরাঁয় এ আয়োজন চলবে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে। এ জন্য জনপ্রতি দিতে হবে ৮ হাজার ৫০০ টাকা।

খাবারের টেবিলেই এক বিশ্বভ্রমণ

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের পক্ষ থেকে অতিথিদের স্বাগত জানানো হয়। হোটেল কর্তৃপক্ষের ভাবনাটিও বেশ সুন্দর। খাবার শুধু স্বাদের বিষয় নয়, একটি দেশের খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনযাপন। সেই বৈচিত্র্য খাবারের মাধ্যমে তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

সজ্জাতেও ছিল সেই আবহ

বিভিন্ন দেশের খাবারকে আলাদা করে তুলে ধরতে ক্যাফে বাজারে সাজানো হয়েছে বেশ কয়েকটি স্টেশন। কন্টিনেন্টাল ক্ল্যাসিক, বাংলাদেশি হেরিটেজ, লাইভ সালাদ বার, সাব্রেসো ডি মেক্সিকো, স্প্যানিশ স্প্লেন্ডার, মুঘল দরবার, চায়নিজ স্টেশন, জাপানিজ কর্নার এবং পার্সিয়ান ডেলিকেসি। নামের মধ্যেই যেন প্রতিটি স্টেশনের নিজস্ব গল্প।
সব দেশ বিমানে চড়ে ঘুরে দেখা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু খাবারের মাধ্যমে সেই দেশের স্বাদ ও খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে খুব সহজেই। ‘বন ভয়াজ’ সেই অভিজ্ঞতাটিই দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

স্যুপ দিয়ে শুরু

মরোক্কান স্টাইলে ল্যাম্ব হারিসা স্যুপ এবং ফরাসি রন্ধনশৈলীর রোস্টেড পাম্পকিন স্যুপ ছিল শুরুতেই মনোযোগ কাড়ার মতো।

ল্যাম্ব হারিসায় ছিল মাংস ও মসলার গভীর স্বাদ, আর রোস্টেড পাম্পকিন স্যুপ ছিল তুলনামূলক নরম, মোলায়েম ও ক্রিমি। ক্রিমি সুপের সঙ্গে সামান্য বাটার যোগ করলে এর স্বাদ আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। যাঁরা মোলায়েম ও আরামদায়ক স্বাদের স্যুপ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এটি বেশ উপভোগ্য হতে পারে।

স্যুপের পর অবশ্য আর থামার সুযোগ নেই। সামনে তখন একের পর এক নানা দেশের খাবার।

ব্রিটিশ ডিশ বিফ ওয়েলিংটন

লাইভ স্টেশনের সামনে গিয়ে প্রথমেই চোখ আটকে যায় ব্রিটিশ ডেলিকেসি বিফ ওয়েলিংটনে। খাবারটির নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসও। বিফ ওয়েলিংটন নামটি ১৮১৫ সালের ওয়াটারলু যুদ্ধে নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে পরাজিত করা ব্রিটিশ সেনাপতি আর্থার ওয়েলেসলি, প্রথম ডিউক অব ওয়েলিংটনের নাম থেকে এসেছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়।

বিফ ওয়েলিংটন

তবে এর নামকরণ নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। কারও মতে, এটি ডিউক অব ওয়েলিংটনের পছন্দের খাবার ছিল। আবার কেউ মনে করেন, খাবারটির সোনালি বাদামি আবরণ দেখতে ওয়েলিংটন বুটের মতো হওয়ায় এমন নাম। আরেকটি মত হলো, ফরাসি খাবার ফিলে দ্য বফ আঁ ক্রুত থেকে ব্রিটিশ পরিচয়ে ‘বিফ ওয়েলিংটন’ নামটির প্রচলন।

ক্ল্যাসিক বিফ ওয়েলিংটনে নরম টেন্ডারলয়েনের মাঝের অংশে মাস্টার্ড মাখিয়ে তার চারপাশে মাশরুমের ডিউক্সেল ও প্রসিউটো জড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর পুরো মাংসকে সোনালি পাফ পেস্ট্রি শিটে মুড়িয়ে বেক করা হয়।

প্লেটে নেওয়ার পর প্রথম কাটেই বাইরের পেস্ট্রির খসখসে স্তর আর ভেতরের কোমল মাংসের পার্থক্য বোঝা যায়। সঙ্গে ছিল ক্রিমি প্যাপ্রিকর্ন সস। সব মিলিয়ে এটি এমন একটি পদ, যার স্বাদ মুখে থাকার পাশাপাশি খাবারের টেবিলে একটি আলাদা আনন্দও তৈরি করে।

পেকিং ডাক

এরপর উপভোগ্য হতে পারে চীনের ক্ল্যাসিক পেকিং স্টাইল রোস্টেড ডাক। হাঁসের মাংসের নিজস্ব স্বাদ ও রোস্ট করার ধরনটি বেশ ভালো লেগেছে।

মাটনের পায়ায় মধ্যপ্রাচ্যের স্বাদ

কাওয়ারা

পাশেই ছিল মাটন পায়া। আমাদের পরিচিত এই পদটির মধ্যপ্রাচ্যেও নিজস্ব পরিচয় রয়েছে। সেখানে এটি কাওয়ারা বা কাওয়ারেহ নামে পরিচিত।
ঘি, আদা, পেঁয়াজের বেরেস্তা আর মাটনের হাড়ের ভেতরের নরম মজ্জা। এই কয়েকটি উপাদান একসঙ্গে মিশে যে গভীর স্বাদ তৈরি করে, সেটি সহজে ভোলার নয়। যাঁরা মাটনের পায়া পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে এই পদটি আলাদা করে ভালো লাগতে পারে।

মিসরীয় দোলমায় আর আলী সাহেবের স্মৃতি

মিসরীয় দোলমা সামনে আসতেই আমার মনে পড়ে যায় প্রিয় লেখক, খাদ্যরসিক ও পরিব্রাজক সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘জলে ডাঙায়’ ভ্রমণকাহিনির একটি খাবারের বর্ণনা।
মিসরে খাবারের অভিজ্ঞতা লিখতে গিয়ে তিনি বর্ণনা করেছিলেন এমন একধরনের ভরা শসার কথা। শসার ভেতরে ছিল পোলাও, কিমা, টমেটো ও দেশি পনির। তাঁর চোখে সেটি হয়ে উঠেছিল একসঙ্গে কয়েক স্বাদের অসাধারণ খাবার। আমাদের মাছ কিংবা পটোলের দোলমার সঙ্গে যার মূল ভাবনার মিল রয়েছে।

মিশরিয় দোলমা

সোনারগাঁওয়ের দোলমা অবশ্য শসা দিয়ে নয়, বেবি ক্যাবেজ দিয়ে তৈরি। ফলে পরিচিত দোলমার সঙ্গে এর পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। ভেতরের পুর আর সবজির মেলবন্ধনে এটি ছিল আলাদা ধরনের একটি পদ, যা স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি খাবারের সংস্কৃতির বৈচিত্র্য নিয়েও ভাবায়।

এক টেবিলে মেক্সিকো থেকে ইতালি

স্প্যানিশ স্টাইল গার্লিক প্রন, মেক্সিকান রাইস, বিফ ফাহিতাস, ইতালীয় চিকেন মিলানেজ, জিরা রাইস, পেনে পাস্তা আরাবিয়াতা এবং বিফ লাজানিয়া—নানা স্বাদের সম্ভার।

স্প্যানিশ গার্লিক প্রন

ফরাসি খাবারের মধ্যে ছিল Coq au Vin, অর্থাৎ ওয়াইনে রান্না করা চিকেন। ইতালীয় খাবারের তালিকায় ছিল গ্রাতিন দফিনোয়া। চীনা স্টেশনে কুং পাও চিকেন ও সুইট অ্যান্ড সাওয়ার চিকেন, জাপানিজ কর্নারে চিকেন ইয়াকিতোরি, টেরিয়াকি ভেটকি ও চিকেন গয়োজা ছিল উল্লেখযোগ্য।

বিফ ফাহিতাস

প্রতিটি খাবারের স্বাদ এক রকম নয়, সেটিই স্বাভাবিক। বরং এ আয়োজনের সৌন্দর্য এখানেই যে একই টেবিলে দাঁড়িয়ে স্বাদের এত বৈচিত্র্যের মুখোমুখি হওয়া যায়। কোথাও মসলার ঝাঁজ, কোথাও সসের মিষ্টি ও টক স্বাদ, কোথাও আবার মাংসের নিজস্ব স্বাদকে সামনে রাখা হয়েছে।
এই বিশাল আয়োজনের পেছনে স্যু শেফ আরশাদ আলীর নেতৃত্বে রান্নাঘরের পুরো দলটির পরিশ্রমের কথা বলতেই হয়। এতগুলো দেশের খাবারকে একই আয়োজনে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে বড় একটি কাজ।

পার্সিয়ান ডেলিকেসির আকর্ষণ

পার্সিয়ান ডেলিকেসির আছে আলাদা আকর্ষণ। ইরানের খাদ্য সংস্কৃতির ইতিহাস দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। সেই ঐতিহ্যের কিছু স্বাদ পাওয়া যায় কাবাব কোবিদেহ, কাবাব সোলতানি ও জোজেহ কাবাবের মতো পদে। তিন ধরনের কাবাবের স্বাদেই মেলে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
এর সঙ্গে ছিল বিভিন্ন ধরনের ভাত, হার্ব, জলপাই তেল ও সবজির পরিবেশন। মসলার পরিমিত ব্যবহারেই, স্বাদে ছিল গভীরতা। ইরানি রান্নার সৌন্দর্য অনেকটা এখানেই। খুব বেশি উপকরণ দিয়ে স্বাদকে ভারী না করে, কয়েকটি উপাদানকে নিজেদের স্বাদে কথা বলতে দেওয়া।

পারস্যের কাবাব

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরান দূতাবাসের প্রথম কাউন্সেলর ও উপপ্রধান মিশন ইসরাফিল আমির এ আয়োজনে ইরানি খাবার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান। বিশেষ করে কাবাব সোলতানি নিয়ে নিজের আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

খাবারের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ

আয়োজনের অংশীদারদের মধ্যেও খাবার ও সংস্কৃতির এই সম্পর্কের কথাই উঠে এসেছে। এনসিসি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, খাবার ও পর্যটন মানুষের সঙ্গে মানুষের, সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির এবং দেশের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ তৈরি করে। ভ্রমণের পাশাপাশি খাবারের মাধ্যমেও বিভিন্ন সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার সুযোগ তৈরি হয়।
মাংস সরবরাহ সহযোগী হিসেবে রয়েছে কোয়ালিটি ইন্টেগ্রেটেড অ্যাগ্রো। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক উজায়ার হাফিজ নিরাপদ ও মানসম্মত মাংস সরবরাহকে তাঁদের কাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
আয়োজনের অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে এনসিসি ব্যাংক, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস এবং কোয়ালিটি ইন্টেগ্রেটেড অ্যাগ্রো।
এ আয়োজনে কেবল স্বাদ উপভোগ নয়, মালদ্বীপ ভ্রমণের সুযোগও আছে। দুজন বিজয়ী ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে পাবেন ঢাকা-মালদ্বীপ-ঢাকার বিমান টিকিট।

শেষটায় মিষ্টিমুখ

যেকোনো আয়োজনেরই শেষ হয় মিষ্টিতে। এ যাত্রায়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বরং শেষটাও একটা গল্প দিয়েই হতে পারে।
নানা ধরনের মিষ্টির পদ সামনে সাজানো। আর সেখানেই আবার মনে পড়ে গেল সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা। ‘জলে ডাঙায়’ তিনি বাঙালির খাবারের স্বাদ নিয়ে লিখেছিলেন, ‘আমাদের খাবারে তেতো, নোনতা, ঝাল, টক ও মিষ্টি—এই পাঁচ ধরনের স্বাদের উপস্থিতি রয়েছে। ইংরেজদের খাবারে ঝাল ও টকের ব্যবহার কম, তেতো স্বাদেরও তেমন প্রচলন নেই বলে তিনি রসিকতার সঙ্গে ইংরেজি রান্নাকে বাঙালির চোখে কিছুটা পানসে বলে বর্ণনা করেছেন। তবে কেক, পেস্ট্রি ও পুডিংয়ের ক্ষেত্রে ইংরেজদের দক্ষতার কথাও স্বীকার করেন তিনি।

নানা স্বাদের মিষ্টি

খাবার নিয়ে এমন লেখাই আসলে খাবারকে শুধু খাবার থাকতে দেয় না। একটি পদ থেকে চলে যাওয়া যায় একটি দেশ, একটি সংস্কৃতি কিংবা একটি পুরোনো গল্পের কাছে।
শেষ পর্যন্ত ‘বন ভয়াজ’ কেমন?
এক সন্ধ্যায় পৃথিবীর এতগুলো দেশের খাবারের স্বাদ–অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে অনন্য। তবে এ আয়োজনের সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গা শুধু খাবারের সংখ্যা নয়; বরং প্রতিটি স্টেশন মনে করিয়ে দেয় খাবারেরও আছে ভ্রমণকাহিনি।

ছবি: হাল ফ্যাশন

Read full story at source