চাকরির ভাইভার নম্বর বৃদ্ধি: সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুন

· Prothom Alo

‘এটাও ইতিহাসের শিক্ষা যে, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।’ দুই বছর পেরিয়ে যেতে না যেতেই কিছু মানুষ হয়তো মন থেকে হারিয়ে ফেলেছে যে সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে বৈষম্যের জন্য এত বড় একটা আন্দোলন হয়েছে। ২০২৪ সালে যে আন্দোলন হয়েছিল, তার মূল দাবি ছিল সর্বস্তরে মেধার মূল্যায়ন। এখন নতুনভাবে প্রশ্ন উঠছে—কোটা ভিন্ন আঙ্গিকে ফিরছে কি না?

Visit mchezo.co.za for more information.

বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রক্সি, ঘুষ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মতো ঘটনা সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের কাছে নতুন কিছু নয়। এটা নিত্যদিনের ঘটনা। এগুলো কমানোর চেষ্টা না করে নতুনভাবে বৈষম্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।

চাকরির (১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে) লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ভাইভায় বৃদ্ধি করলে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা, এখানে স্পষ্টত পছন্দের প্রার্থীকে নম্বর বেশি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। অনেকের ধারণা, লিখিত পরীক্ষায় কোনো রকম পাস করা দলীয় বা ব্যক্তিগত অথবা ঘুষ খেয়ে চাকরি পাইয়ের দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগে লিখিত পরীক্ষায় কেউ কম নম্বর পেলে ভাইভায় তাঁকে পুরো নম্বর দিয়েও পাস করানো যেত না। লিখিত পরীক্ষায় এগিয়ে থাকা মেধাবী প্রার্থীই এগিয়ে থাকতেন। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে কোনো রকম পাস করা পরীক্ষার্থীকে ভাইভায় বেশি নম্বর দিয়ে সহজেই চাকরি দেওয়া সম্ভব হবে।

ধরা যাক, ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী ৭০ নম্বর পেলেন, আরেকজন পেলেন ৫০ নম্বর। আবার ৫০ নম্বরের ভাইভায় প্রথম প্রার্থী পেলেন ২০ নম্বর এবং দ্বিতীয় প্রার্থী পেলেন ৪৫ নম্বর, তাহলে দ্বিতীয় প্রার্থী সামনে চলে আসবেন। এখন কথা হলো, কে বেশি মেধাবী? দ্বিতীয় প্রার্থী কোন বিবেচনায় বেশি নম্বর পেলেন? এগুলো কি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে? উত্তর মনে হয় না ‘হ্যা’ হবে। কারণ, এখানেই তাদের আসল চালাকি। যেহেতু এই নম্বরগুলো প্রকাশ করা হয় না, সেহেতু কে কত নম্বর কোন বিবেচনায় পেলেন, সেটা নিয়ে কারও প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

মূলত বাংলাদেশের কোনো কিছুই স্বচ্ছ নয়। এ ধরনের বিধিমালা প্রণয়নের ফলে স্পষ্টত নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতি বাড়বে। দলীয় লোক নিয়োগের জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। যাঁরা সরকারি চাকরির পরীক্ষায় জালিয়াতি ঠেকাতে পারছেন না, তাঁরা ভাইভার মাধ্যমে নিয়োগ স্বচ্ছ করবেন, সেটা হাস্যকর যুক্তি ছাড়া কিছুই নয়। কেবল ভাইভায় ভরসা করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া যে কতটা স্বচ্ছ, সেটা আমাদের সবারই জানা। তাই এমন একটা সিদ্ধান্ত যে লাখ লাখ বেকার চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে শঙ্কা ও ক্ষোভ তৈরি করবে, সেটা সরকারের জন্য শুভ হবে না।

এই যুগে দাঁড়িয়ে সরকারের দেওয়া যুক্তিগুলো খুবই অযৌক্তিক মনে হয়। কোটা আন্দোলনে সরকারি চাকরিতে মেধার মূল্যায়ন বাড়ানোর দাবিই ছিল মুখ্য। যেখানে দাবি ছিল লিখিত পরীক্ষায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন বাড়িয়ে ভাইভার প্রভাব কমানো। সেখানে সরকার কেন উল্টো পথে হাঁটছে, এটা স্পষ্ট বোঝা না গেলেও ধারণা করা যায়—ভাইভার নম্বর বেশি হলে তদবির, ঘুষ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে প্রার্থীর চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাবে।

সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রক্সি, ডিভাইস পার্টি, ঘুষ ও দুর্নীতি রোধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ অবস্থায় সরকারের কঠোর আইন প্রয়োগ করা আমাদের কাম্য। আইন করে তাঁরা যেন আর কখনো কোনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা করা উচিত। সেই সঙ্গে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল আরও স্বচ্ছ করার জন্য একজন প্রার্থী লিখিত ও মৌখিকে কত নম্বর পেলেন এবং মোট কত হলো—এ তথ্য ফাইনাল ফলাফল হিসেবে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। এতে নিয়োগব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে।

সর্বোপরি, এখন পর্যন্ত পিএসসি ও ব্যাংকের নিয়োগ নিয়ে তুলনামূলক কম প্রশ্ন উঠেছে। তাই সব গ্রেডের সরকারি চাকরির পরীক্ষা পিএসসির মাধ্যমে নেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। প্রস্তাবিত এই পদ্ধতি সরকারের গলার কাঁটা হয়ে বিঁধার আগেই এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুন। শিক্ষার্থী ও লাখ লাখ বেকারের দেশে তাঁদের সঙ্গে তামাশা করবেন না। ভাইভায় অতিরিক্ত নম্বর রাখা স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আঞ্চলিক বৈষম্যকে উৎসাহিত করবে, যা মেধার মূল্যায়নে বাধা সৃষ্টি করে। দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ ও সাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় এই বৈষম্যমূলক নম্বর বরাদ্দ নীতি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। নীতিনির্ধারকেরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আমরা আশা রাখি।

*মো. মিলন হোসেন, শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source