কয়েক দশক ধরে চলছে আর্জেন্টাইন পিঁপড়াদের বিশ্বযুদ্ধ

· Prothom Alo

মার্ক ডব্লিউ মফেট একজন পতঙ্গবিজ্ঞানী। তিনি স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে প্রাণীদের সামাজিক আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

ঠিক এই মুহূর্তে একটি বিশ্বযুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের ময়দানে প্রতি সপ্তাহে মারা যাচ্ছে লাখ লাখ প্রাণী। অথচ এসব খবর কখনোই সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না।

কারণ, এই যুদ্ধের কোনো যোদ্ধা মানুষ নয়, এরা সবাই পিঁপড়া। ছয়টি মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত বিশাল কলোনির মধ্যে কয়েক দশক ধরে লড়াই চলছে। দেখতে ছোট হলেও পিঁপড়াদের এই মারামারি মানুষের যেকোনো যুদ্ধের চেয়েও অনেক বড় ও ব্যাপক।

তবে অদ্ভুত বিষয় হলো, এদের এই লড়াই ও পেছনের কারণগুলো খেয়াল করলে মানুষের আচরণের সঙ্গেই মিল পাওয়া যায়।

স্কুলের শিক্ষক খুঁজে পেলেন বিরল টি–রেক্সের পায়ের ছাপ

আর্জেন্টাইন পিঁপড়া একটি আগ্রাসী প্রজাতি। এদের আদি নিবাস উত্তর আর্জেন্টিনা ও এর আশপাশের অঞ্চল। মানুষের যাতায়াতব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ে এরা বিশ্বের দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। এরা অন্তত ডজনখানেক বিশাল কলোনি বা রাজ্য গড়ে তুলেছে। এসব এলাকা এতই বড় যে প্রায়ই এক রাজ্যের সীমানা অন্য রাজ্যের মুখোমুখি হয়। আর এর পরিণতি হয় অত্যন্ত সহিংস ও নির্মম।

আর্জেন্টাইন পিঁপড়ার বৈজ্ঞানিক নাম লাইনপিথেমা হুমাইল (Linepithema humile)। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার এসকনডিডো এলাকায় এই যুদ্ধ বেশ তীব্র। সেখানে কোনো বাড়ির উঠানের ঘাস সরালেই চোখে পড়বে মৃত পিঁপড়াদের স্তূপ। আর সেই স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এদের জীবিত সঙ্গীরা সুশৃঙ্খলভাবে শত্রুদের ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে। সৌভাগ্যের বিষয় হলো, পিঁপড়ারা চিৎকার করতে পারে না।

সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকায় থাকার সময় পতঙ্গবিজ্ঞানী মার্ক ডব্লিউ মফেটের সঙ্গে আর্জেন্টাইন পিঁপড়াদের পরিচয় হয়। সেখানে বাড়ির আঙিনায় দুই থেকে তিন মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের লাখ লাখ কর্মী-পিঁপড়ার দেখা মেলে। এদের সংখ্যা এত বেশি যে এরা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। এরা স্থানীয় প্রজাতির দরকারি পিঁপড়াদের মেরে বিলুপ্ত করে ফেলে।

পতঙ্গবিজ্ঞানী মার্ক ডব্লিউ মফেটের মতে, তিনি যদি সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া থেকে একটি আর্জেন্টাইন পিঁপড়াকে মেক্সিকোর ৫০০ মাইল দক্ষিণে নিয়ে যেতেন, তবে সীমান্ত পার হতে তাঁর নিজের পাসপোর্টের প্রয়োজন হতো। কিন্তু সঙ্গী পিঁপড়াটির কোনো পাসপোর্ট লাগত না।

বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ কি জেমি বিটন

এর কারণ, একই কলোনির পিঁপড়ারা নিজেদের শরীরের বিশেষ ঘ্রাণ দিয়ে পরস্পরকে চিনতে পারে। এই ঘ্রাণই মূলত এদের নিজস্ব জাতীয় পতাকার মতো কাজ করে। ফলে সান ফ্রান্সিসকো ও মেক্সিকোর আর্জেন্টাইন পিঁপড়ারা আসলে একই কলোনি বা দেশের নাগরিক। ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে বড় কলোনিজুড়ে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এলাকায় এই পিঁপড়াদের বিলিয়ন বিলিয়ন সদস্য বাস করে।

মানুষ ও পিঁপড়া উভয় সমাজেই হিংসাত্মক লড়াইয়ের ধরন নির্ভর করে এদের জনসংখ্যার ওপর

কিন্তু পতঙ্গবিজ্ঞানী মার্ক ডব্লিউ মফেট যদি সেই পিঁপড়াটিকে সান ডিয়েগোর উত্তরে এসকনডিডোতে নিয়ে ভুল করে শত্রুর সীমানায় ছেড়ে দিতেন, তবে এরা ওকে মুহূর্তেই বহিরাগত শত্রু হিসেবে চিনে ফেলত। তারপর আক্রমণ করে একে টুকরো টুকরো করে কাটত। আসলে পুরো দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া দখল করে আছে চারটি যুদ্ধরত আর্জেন্টাইন পিঁপড়ার সুপারকলোনি। শহরের চারপাশ ঘিরে এসব রাজ্যের সীমানা মিলেছে। শতবর্ষ আগে এই প্রজাতি এখানে আসার পর থেকেই এদের মধ্যে লড়াই চলছে। প্রতিনিয়ত যুদ্ধের গতিপথ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে এদের সীমানাও বছরের পর বছর বদলাতে থাকে।

পতঙ্গবিজ্ঞানী মার্ক ডব্লিউ মফেট জানান, মানুষ ও পিঁপড়া উভয় সমাজেই হিংসাত্মক লড়াইয়ের ধরন নির্ভর করে এদের জনসংখ্যার ওপর। ছোট সমাজগুলো সাধারণত সরাসরি আক্রমণ এড়িয়ে চলে। আমাদের অনেক আগের পূর্বপুরুষেরা যখন শিকারি-সংগ্রাহক হিসেবে ঘুরে বেড়াত। তখন ছোট ছোট দলগুলো সংঘর্ষ এড়িয়ে চলত। কোনো জায়গা ছেড়ে চলে গেলে তাদের হারানোর কিছু ছিল না। কারণ, তাদের রক্ষা করার মতো কোনো স্থায়ী ঘরবাড়ি বা জমানো খাবার ছিল না। আর তারা আক্রমণ করলেও দ্রুত সরে আসত, যেন নিজেদের কোনো ক্ষতি না হয়।

সুপার এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমিও এখন রঙিন ফুলের বাগান

ছোট কলোনিতে থাকা পিঁপড়াদের ক্ষেত্রেও ঠিক একই নিয়ম খাটে। কিন্তু যুদ্ধের হিসাব একেবারে আলাদা। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কেবল তখনই শুরু হয়, যখন সমাজ বা কলোনি অনেক বড় হয়ে যায় এবং কোনো নির্দিষ্ট সম্পদের ওপর এদের স্থায়ী দখল জমে ওঠে। জনসংখ্যা বেশি হলেই মানুষ কিংবা পিঁপড়া উভয় সমাজেই যুদ্ধের পাল্লা ভারী হয়ে ওঠে। এভাবেই তৈরি হয় একের পর এক পদাতিক সৈন্য, তা সে মানুষই হোক কিংবা পিঁপড়া।

পৃথিবীকে নির্দিষ্ট সীমানায় ভাগ করলে সংঘাত দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। পিঁপড়াদের ক্ষেত্রে এটা শতভাগ সত্য। ভিন্ন কলোনির সঙ্গে এরা কখনোই মিলেমিশে থাকে না। হয় এড়িয়ে চলে নয়তো আক্রমণ করে।

এমনকি নেকড়ে, সিংহ, বাদুড়, পাখি বা মাছের মতো অনেক মেরুদণ্ডী প্রাণীও নিজের দল ও এলাকার বাইরে কাউকে সহ্য করতে পারে না। তাই প্রকৃতিতে সংঘাত হওয়াটা মোটেও অবাক করার মতো বিষয় নয়। বরং সংঘাত এড়িয়ে শান্তির ফিরে আসা আসল বিস্ময়।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্টপিকলবল খেলে ১৩ বছরের কিশোরীর বিশ্বভ্রমণ

Read full story at source