যেভাবে বাড়ির নকশা বদলে দিচ্ছে জীবনযাপনের ধরন
· Prothom Alo
একসময় বাড়ির প্রতিটি ঘরের ব্যবহার ছিল অনেকটাই নির্দিষ্ট। বসার ঘর অতিথিদের জন্য, শোবার ঘর বিশ্রামের জন্য আর খাবার ঘর শুধু খাওয়ার জন্য—এভাবেই পরিকল্পনা করা হতো আবাসন। কিন্তু মানুষের জীবনযাপনের ধরন বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ঘরের ব্যবহারও। এখন একই জায়গায় অফিসের কাজ, পড়াশোনা, ব্যায়াম বা বিনোদনের সবকিছুর কথাই ভাবতে হচ্ছে।
ইনসাইড ইন্টেরিয়রের প্রতিষ্ঠাতা সুবর্ণা মুস্তারি বলেন, ‘এখন মানুষ শুধু থাকার জন্য একটি সুন্দর বাড়ি চান না, বরং এমন একটি জায়গা চান, যা একই সঙ্গে কার্যকর, প্রযুক্তিবান্ধব এবং মানসিক প্রশান্তির জন্যও উপযোগী। তাই বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য জায়গা, ওপেন ফ্লোর প্ল্যান, স্মার্ট কিচেন, সবুজ নকশা, স্মার্ট হোম প্রযুক্তি, মিনিমালিস্ট নকশা, প্রয়োজনীয় স্টোরেজ ও ব্যক্তিগত পরিসরের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ আধুনিক বাড়ির নকশায় শুধু সৌন্দর্য ও সাজসজ্জার চেয়ে কার্যকারিতা, স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
Visit grenadier.co.za for more information.
ঘরের আকারের পাশাপাশি আসবাবের নকশাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সহজে সরানো যায় এমন আসবাব, ভাঁজ করে রাখা যায় এমন টেবিল কিংবা একই সঙ্গে একাধিক কাজে ব্যবহার করা যায় এমন ফার্নিচারের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কারণ, এতে ঘরকে স্থায়ীভাবে কোনো একটি কাজে আটকে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদদের আলোচনাতেও এখন আবাসনের ক্ষেত্রে ‘ফ্লেক্সিবল স্পেস’ বা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার পরিবর্তনের উপযোগী জায়গার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, একটি পরিবারের প্রয়োজন সময়ের সঙ্গে বদলায়। শিশু বড় হলে তার পড়াশোনার জায়গা দরকার হতে পারে, আবার পরিবারের কেউ ঘরে বসে কাজ করলে আলাদা কর্মপরিসরের প্রয়োজন তৈরি হয়। তবে বহুমুখী ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে ঘরে অনেক কিছু রাখতে হবে। বরং সীমিত জায়গায় প্রয়োজনীয় জিনিসের সঠিক বিন্যাস, পর্যাপ্ত চলাচলের জায়গা এবং অপ্রয়োজনীয় আসবাব কম রাখাই গুরুত্বপূর্ণ। এতে একই ঘর একাধিক কাজে ব্যবহার করলেও তা অগোছাল হয়ে ওঠে না।
নকশা বদলালে বদলায় দৈনন্দিন অভ্যাসও
বাড়ির নকশা শুধু জায়গার সৌন্দর্য বা সুবিধার বিষয় নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ঘরে কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট একটি জায়গা থাকলে কাজের সময় মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হতে পারে। আবার বিশ্রামের জায়গা যদি কাজের জায়গা থেকে আলাদা রাখা যায়, তাহলে কাজ শেষে মানসিকভাবে বিরতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
একইভাবে পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ঘরের বিন্যাস গুরুত্বপূর্ণ। রান্নাঘর, খাবার জায়গা ও বসার ঘরের মধ্যে অতিরিক্ত দেয়াল বা বিভাজন না থাকলে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের কাজ করতে করতেই একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন। অন্যদিকে ব্যক্তিগত সময় বা নিরিবিলি কাজের প্রয়োজন হলে আলাদা পরিসরও দরকার। অর্থাৎ আধুনিক আবাসনের নকশায় এখন শুধু কতটি ঘর থাকবে, তা নয়; বরং মানুষ সেই জায়গাগুলো কীভাবে ব্যবহার করবে, সেটিও বিবেচনায় আসছে।
বাড়ির নকশায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের গুরুত্ব বাড়ছে
বাড়ির নকশার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের প্রবেশ। একটি ঘরে দিনের আলো কতটা ঢুকছে, জানালার অবস্থান কোথায়, বাতাস চলাচলের সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয় ঘরের পরিবেশকে সরাসরি প্রভাবিত করে। প্রাকৃতিক আলো পর্যাপ্ত থাকলে দিনের বেলায় কৃত্রিম আলোর ওপর নির্ভরতা কমে। পাশাপাশি ঘরের ভেতর উজ্জ্বল ও স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি হয়। জানালার অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু জানালা থাকলেই হবে না, সেটি এমন জায়গায় থাকা দরকার, যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঘরে প্রবেশ করতে পারে। বাতাস চলাচলের সুযোগও আবাসনের আরামের সঙ্গে যুক্ত। দুটি বিপরীত বা ভিন্নমুখী খোলা অংশ থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ঘরের ভেতর প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলের সুযোগ বাড়ে। ফলে দিনের বিভিন্ন সময়ে ঘরের পরিবেশ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক রাখা সম্ভব হয়।
ছোট জায়গায় বড় পরিবর্তন
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে জায়গার সীমাবদ্ধতা বাড়ির নকশাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বড় জায়গা না থাকলেও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি বাসাকে তুলনামূলক আরামদায়ক ও কার্যকর করে তোলা সম্ভব। এর জন্য দরকার ঘরের আকারের পাশাপাশি আলো-বাতাস, আসবাবের বিন্যাস, চলাচলের জায়গা এবং পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনকে একসঙ্গে বিবেচনা করা।
বাড়ির আলো-বাতাস, জানালার অবস্থান ও ঘরের বিন্যাস মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে বলে জানান ইনসাইড ইন্টেরিয়রের প্রতিষ্ঠাতা সুবর্ণা মুস্তারি। তিনি বলেন, ‘ভালোভাবে পরিকল্পিত একটি ঘরের নকশা মানুষের মুড ও মানসিক সুস্থতা ভালো রাখতে, কাজের সময় মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং চলাফেরায় নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো ও সঠিক ভিজ্যুয়াল কমফোর্টও ঘরের পরিবেশকে আরও আরামদায়ক করে তোলে।’
ভবিষ্যতের আবাসন তাই শুধু বেশি জায়গা দেওয়ার প্রতিযোগিতা নয়। বরং একই জায়গাকে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমন নকশা প্রয়োজন, যেখানে কাজ, বিশ্রাম, পারিবারিক সময় ও ব্যক্তিগত পরিসর—সবকিছুর জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী জায়গা তৈরি করা সম্ভব।
কারণ, শেষ পর্যন্ত বাড়ি শুধু থাকার জায়গা নয়। দিনের বেশির ভাগ সময় যে জায়গায় কাটে, সেই জায়গার নকশাই অনেকটা নির্ধারণ করে দেয় সেখানে মানুষ কীভাবে চলবে, কাজ করবে, বিশ্রাম নেবে এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবে। নিজের পছন্দসই নকশায় নিজের আবাসন বেছে নিতে অনলাইন আবাসন মেলার মতো আয়োজনও এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।