পুত্রবধূকে ‘চাকরি না দেওয়ায়’ বিদ্যালয়ে তালা দিলেন সাবেক দাতা সদস্য, মাঠে কলাগাছ রোপণ

· Prothom Alo

রাজশাহীর পুঠিয়ায় একটি বিদ্যালয়ের মাঠে কলাগাছ রোপনের পাশাপাশি শিক্ষকদের কার্যালয়ে তালা দিয়েছেন ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক একজন দাতা সদস্য। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন তিনি। পুত্রবধূকে চাকরি না দেওয়ায় এবং বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করায় তিনি এ কাজ করেছেন বলে জানিয়েছেন। যদিও পূত্রবধূকে চাকরি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক।

বিদ্যালয়টির নাম ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুল। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠার সময় বিদ্যালয়টির নাম ছিল মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। আজ শনিবার সপ্তাহিক ছুটির দিনে ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক দাতা সদস্য আজাদ আলী লোকজন নিয়ে মাঠে কলাগাছ লাগান এবং শিক্ষকদের কার্যালয়ে লাগানো তালার ওপর আরেকটি তালা দেন।

Visit moryak.biz for more information.

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় প্রাক–প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি ছিল না। শুধু প্রাথমিকে পাঠদান করানো হতো। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তনের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। তখন বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা সভা করে ‘ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুল’ নামকরণ করেন। তৎকালীন দাতা সদস্য আজাদ আলী নিজেই এ নাম প্রস্তাব করেছিলেন বলে রেজুলেশনে উল্লেখ আছে।

২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর নিম্ন মাধ্যমিকের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমতি পায় প্রতিষ্ঠানটি। তবে এমপিওভুক্ত হয়নি। বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা পড়ছে। পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থীরা ওপরের শ্রেণিতে উঠলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের অনুমোদন নিতে হবে। এর মধ্যে আজ শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আজাদ আলী লোকজন নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কার্যালয়ে দেওয়া তালার ওপর আরেকটি তালা দেন। পাশাপাশি বাঁশ দিয়ে প্রধান ফটকে বেড়া এবং মাঠে কলাগাছ লাগিয়ে দেন।

রাজশাহীর পুঠিয়ার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কার্যালয়ে তালার ওপরে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। শনিবার বিকেলে উপজেলার ভালুকগাছি গ্রামে

স্থানীয় দোকানি লাল মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, আগে বিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থী ছিল। মামলা করার কারণে কমে গেছে। তারপরেও ক্লাস হয়। আজ হঠাৎ করে আজাদ আলী এসে এমনভাবে বেড়া দিয়ে গেছেন, তাঁরা বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিও নিতে পারছেন না।

জানতে চাইলে আজাদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানের একজন দাতা সদস্য ছিলেন। সেখানে টেকনিক্যাল কলেজ করে তাঁর ছেলে ও ছেলের বউকে চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টেকনিক্যাল কলেজের মতো কোনো প্রতিষ্ঠান হয়নি। তাঁর ছেলের বউকেও চাকরি দেওয়া হয়নি। এ জন্য তিনি তালা দিয়ে কলাগাছ লাগিয়ে দিয়েছেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, আজাদ আলী নিঃশর্তভাবে প্রতিষ্ঠানে জমি দান করেছিলেন। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দিয়ে প্রতিষ্ঠানিক কার্যক্রম চালু করতে বলেছিলেন। স্থাপনা নির্মাণের পর প্রতিষ্ঠানের নামে জমি রেজিস্ট্রি করতে গিয়ে তিনি ভোকেশনাল শাখায় ছেলেকে এবং কলেজ শাখায় ছেলের বউয়ের চাকরি দাবি করেন। কমিটি বাধ্য হয়ে সম্মতি দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে নেয়।

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে কলেজ শাখা চালু হতে দেরি হওয়ায় আজাদ আলী তাঁর ছেলের বউকে প্রাথমিক শাখায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে ঢোকান। চাকরি করা অবস্থায় ২০২২ সালে তিনি মারা যান। এরপর ছেলেকে দ্বিতীয় বিবাহ করিয়ে সেই বউকেও মাধ্যমিক শাখার কেরানি পদে চাকরি দিতে বলেন। কমিটি তাতেও সম্মত হয়। এ বিষয়েও যথাযথ রেজুলেশন আছে। এর প্রায় এক বছর পর ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর আদালতে তিনি একটি মামলা করেন। এতে দাবি করেন, যে নামে প্রতিষ্ঠান করার জন্য জমি দিয়েছিলেন, সেই নামে প্রতিষ্ঠান হয়নি। এই মামলা বর্তমানে চলছে। এ অবস্থায় তিনি প্রতিষ্ঠানে তালা লাগিয়ে মাঠে কলাগাছ লাগিয়ে দিয়েছেন।’

পুঠিয়ায় বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বেড়া দিয়েছে এক দাতা সদস্য। শনিবার বিকেলে উপজেলার ভালুকগাছি গ্রামে

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও ভালুকগাছি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা প্রতিষ্ঠান তো একদিনে দাঁড়ায় না। ওই দাতা সদস্যের দাবি সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী আছে, রীতিমতো পাঠদান চলছে। গত মাসের ১০ তারিখে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড নতুন ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদন দিয়েছে।’

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমান প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি তিনি অবগত। তিনি ঢাকায় আছেন। আগামীকাল ফিরে তিনি প্রতিষ্ঠান চালু করার ব্যবস্থা করবেন। পেছনে যে ঘটনাই থাকুক, শিক্ষার্থী থাকলে সেই প্রতিষ্ঠান কেউ বন্ধ করতে পারবেন না।

Read full story at source