এল ক্লাসিকোর ফল ঠিক করে দিতে পারে যে পাঁচ প্রশ্নের উত্তর

· Prothom Alo

সময় বড় নিষ্ঠুর। কত স্মৃতি জমা করে রাখে মনের অ্যালবামে। আবার কত কিছু কেড়ে নেয়।

Visit catcross.org for more information.

এল ক্লাসিকোর কথাই ধরুন। একসময় লিওনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মাঠে নামতেন। ফুটবল–বিশ্ব যেন দুই ভাগ হয়ে যেত। মেসির বাঁ পায়ের জাদু, রোনালদোর দুরন্ত গতি। সঙ্গে পেপ গার্দিওলা আর জোসে মরিনিওর মস্তিষ্কের যুদ্ধ। সে এক আশ্চর্য সময়!

সেই দিন আর নেই। তবে স্মৃতির আগুন একেবারে নিভেও যায়নি। নতুন যুগে লামিনে ইয়ামাল আর কিলিয়ান এমবাপ্পে। তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবে ডালপালা মেলছে। মহিরুহ হতে সময় লাগবে।

কিন্তু এল ক্লাসিকো তো এল ক্লাসিকোই!

আগামীকাল রাতে ক্যাম্প ন্যুতে মুখোমুখি বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ। লা লিগায় ৯ ম্যাচে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে বার্সা। সমান ম্যাচে ২১ পয়েন্ট নিয়ে তিনে রিয়াল। মাদ্রিদের দলটি হারলে শিরোপার দৌড়ে ব্যবধান হয়ে যাবে ৯ পয়েন্ট।

হান্সি ফ্লিকের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বীকে অনেকটা পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ। মরিনিওর সামনে বিপর্যয় এড়ানোর চ্যালেঞ্জ।

এই মহারণের আগে পাঁচটি বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে ফুটবল–বিশ্বে।

বার্সেলোনার অনুশীলনে রাফিনিয়া

রাফিনিয়ার পায়ে কি জয়ের চাবি

পরিসংখ্যান কখনো কখনো ফুটবলের ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার চেষ্টা করে। রাফিনিয়ার ক্ষেত্রে যেমন।

ব্রাজিলিয়ান তারকা খেলেছেন, এমন সর্বশেষ ছয় এল ক্লাসিকোর সব কটিতেই জিতেছে বার্সেলোনা। নিজে করেছেন ৭ গোল, ৩ অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ রিয়ালের বিপক্ষে মাঠে নামলেই যেন অন্য এক রাফিনিয়া!

চলতি মৌসুমেও দুরন্ত ছন্দে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১০ ম্যাচে ১৪ গোল। লিগে ৮ ম্যাচে ১২ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা।

চোট কাটিয়ে পিএসজির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগে ফিরেছেন। বার্সা সেই ম্যাচ হারলেও রাফিনিয়ার বিশ্বাসে চিড় ধরেনি। তিনি বলেছেন, ওই হার ‘এল ক্লাসিকোয় কোনো প্রভাব ফেলবে না।’

আত্মবিশ্বাসটা অমূলক নয়। রাফিনিয়া জ্বলে উঠলে রিয়ালের রক্ষণে আগুন লাগতেই পারে।

মরিনিওর পুরোনো রূপ কি ফিরবে

ফুটবল কখনো কখনো অদ্ভুত বৃত্ত তৈরি করে।

একসময় বার্সেলোনার সহকারী কোচ ছিলেন জোসে মরিনিও। প্রধান কোচ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পরে রিয়ালের দায়িত্ব নিয়ে সেই বার্সেলোনারই সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছিলেন।

মনে আছে ২০১১ সালের স্প্যানিশ সুপার কাপ? বার্সার সহকারী কোচ তিতো ভিয়ানোভার চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন মরিনিও। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত দৃশ্য।

রিয়াল মাদ্রিদ কোচ জোসে মরিনিও

সেই মরিনিও আবার রিয়ালের ডাগআউটে। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথম এল ক্লাসিকো।
বয়স তাঁকে কিছুটা শান্ত করেছে। কিন্তু মরিনিওর ভেতরের আগুন কি এত সহজে নেভে?

প্রথম মেয়াদে ১৭ এল ক্লাসিকোয় তাঁর ৫ জয়, ৬ ড্র, ৬ হার। ২০১৩ সালে রিয়াল ছাড়ার আগে টানা পাঁচ ক্লাসিকোয় অপরাজিত ছিলেন। এবার সংখ্যাটাকে ছয় বানানোর সুযোগ। রিয়ালের কোচদের মধ্যে এর আগে এমন কীর্তি আছে মিগুয়েল মুনোজ ও ভিসেন্তে দেল বস্কের।

অন্যদিকে ফ্লিকের এল ক্লাসিকো রেকর্ড রীতিমতো ঈর্ষণীয়। সাত ম্যাচে ছয় জয়।

দুই কোচের লড়াই তাই শুধু কৌশলের নয়, ব্যক্তিত্বেরও।

রিয়ালের আতিথেয়তায় গোল খেতেই হয়, হলো নতুন রেকর্ড

ক্যাম্প ন্যু কি রিয়ালের দুঃস্বপ্ন হবে

নিজের উঠোনে বার্সেলোনা যেন অজেয় এক দল। ঘরের মাঠে টানা ২৩ লিগ ম্যাচে জয়ের ধারায় তারা। গত মৌসুমে ১৯ ম্যাচের সব কটিতে জিতেছে। এবারও প্রথম চার ম্যাচে জয়। এ মৌসুমে ঘরের মাঠে ৫ ম্যাচে ২২ গোল। অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি ৪টির বেশি!
অন্যদিকে রিয়ালের অ্যাওয়ে ফর্মে অস্বস্তি। সর্বশেষ চার লিগ ম্যাচে দুই জয়, দুই হার। হারগুলো রিয়াল বেতিস ও আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে। জয় এসেছে এস্পানিওল ও এলচের বিপক্ষে।

তবে ইতিহাসের একটা মুচকি হাসি আছে। বার্সার মাঠে সর্বশেষ ছয় লিগ ম্যাচের তিনটিতেই জিতেছে রিয়াল। আগের ১৬ ম্যাচে তাদের জয়ও ছিল তিনটি।
ক্যাম্প ন্যু তাই বার্সার দুর্গ হলেও রিয়ালের কাছে দুর্ভেদ্য নয়।

বার্সেলোনা কোচ হান্সি ফ্লিক

বার্সার রক্ষণ কি সত্যিই নিরাপদ

আক্রমণে বার্সেলোনা যেন গোলের কারখানা। ১২ ম্যাচে ৫০ গোল। পিএসজির কাছে ৪–২ গোলে হারার আগে টানা ১১ জয়। কিন্তু প্যারিসের ক্লাবটি দেখিয়ে দিয়েছে, এই বার্সেলোনারও দুর্বলতা আছে।

ফ্লিকের হাই প্রেসিং প্রতিপক্ষকে দমবন্ধ করে রাখে। লিগে প্রতি ম্যাচে মাত্র ৬.৮টি শট হজম করে বার্সা। এ ক্ষেত্রে সবার সেরা।

অথচ বিপরীত ছবিটা ভয়ংকর। প্রতিপক্ষের প্রতিটি শটের বিপরীতে প্রত্যাশিত গোল বা এক্সজি (xG) মান লিগে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ সুযোগ কম দেয় বার্সা, কিন্তু সুযোগ পেলে প্রতিপক্ষের গোল করার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

তার ওপর চোটের কারণে নেই জুলস কুন্দে। এমবাপ্পে আর ইয়ান দিওমান্দেরা কি এই ফাটল দিয়ে ঢুকে পড়বেন?

ভালভের্দের সঙ্গে মারামারি হয়নি, ‘অপ্রীতিকর’ কিছু একটা ঘটেছিল: দাবি চুয়ামেনির

ভিনিসিয়ুসের অভাব কি টের পাবে রিয়াল

বড় ম্যাচে বড় খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি সাধারণত বড় দুশ্চিন্তা। কিন্তু ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ছাড়াও রিয়ালের আক্রমণে অস্ত্রের অভাব নেই।

নিষেধাজ্ঞায় ব্রাজিলিয়ান তারকা নেই। তাঁর জায়গায় আছেন ইয়ান দিওমান্দে। সেভিয়ার বিপক্ষে রিয়ালের তিন গোলই এসেছে বাঁ প্রান্ত দিয়ে। সেভিয়া ও লাইপজিগের বিপক্ষে গোল এবং অ্যাসিস্ট করে দিওমান্দেও নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন।

ভিনিসিয়ুস জুনিয়র

আর এমবাপ্পে? বার্সার বিপক্ষে ছয় ম্যাচে ছয় গোল। গড়ে প্রতি ৭৫ মিনিটে একটি। জুড বেলিংহামের ছয় এল ক্লাসিকোয় চার গোল, দুই অ্যাসিস্ট। তাঁর তিনটি গোলই ম্যাচ জেতানো। অর্থাৎ ভিনিসিয়ুস না থাকলেও রিয়ালের আক্রমণে বিষদাঁত আছে।

তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিসংখ্যানটা অন্য জায়গায়। এল ক্লাসিকোর ইতিহাসে দুই দলের জয় এখন সমান ১০৬টি করে। ড্র ৫২টি। রিয়ালের গোল ৪৪৪, বার্সার ৪৪১।
এবার লিগে টানা ৯টি জয় নিয়ে ১৯৬৮–৬৯ মৌসুমে মিগুয়েল মুনোজের রিয়ালের গড়া সেরা শুরুর রেকর্ডও ছুঁয়েছে বার্সা। আরেকটি জয় মানেই রেকর্ডটি একার। সব মিলিয়ে একদিকে মরিনিওর পুরোনো হিসাব চুকিয়ে দেওয়ার তাগিদ, অন্যদিকে ফ্লিকের নতুন সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন।

মেসি নেই। রোনালদো নেই। তবু ফুটবলের সবচেয়ে বিখ্যাত এই দ্বৈরথে উত্তেজনার কোনো ঘাটতি নেই।

কারণ, ফুটবলার বদলায়, কোচ বদলায়, যুগ বদলায়। এল ক্লাসিকোর হৃৎস্পন্দন বদলায় না।

Read full story at source