ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন ঝুঁকিগুলো কী
· Prothom Alo
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ হাজার মাইল দূরের হলেও তার অর্থনৈতিক ধাক্কা কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে। এই যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন কী ঝুঁকি তৈরি করবে, তা নিয়ে লিখেছেন গোলাম রসুল
Visit moryak.biz for more information.
গোলাম রসুলমধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ হাজার মাইল দূরে হলেও তার অর্থনৈতিক ধাক্কা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বাজার, শিল্প ও বাড়ির রান্নাঘরে পৌঁছে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে বিঘ্ন ঘটতেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এর প্রভাব দ্রুতই এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর পড়ছে—বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। জ্বালানি আমদানি, উপসাগরীয় শ্রমবাজার ও বৈশ্বিক শিপিং রুটের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দ্রুতই দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। ইতিমধ্যে জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা, খাদ্যপণে৵র দামে ঊর্ধ্বগতি এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। নতুন সরকারের জন্য এটি কোনো দূরের ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়; বরং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রথম বড় পরীক্ষা। আজকের বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে দূরের যুদ্ধও শেষ পর্যন্ত কাছের বাজারের দাম নির্ধারণ করে।
জ্বালানি ধাক্কা ও মূল্যস্ফীতি
আধুনিক অর্থনীতিতে জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল্য–কাঠামো নির্ধারণের একটি মৌলিক উপাদান। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রতি এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৫ শতাংশ আসে আমদানি করা জ্বালানি—তেল, কয়লা ও এলএনজি থেকে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুতই দেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় ছিল প্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এই ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি কঠিন নীতি দ্বিধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে, নাকি ভর্তুকি বাড়িয়ে রাজস্ব ঘাটতির চাপ বাড়ানো হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নির্ধারণ করছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি খুব দ্রুত মূল্যস্ফীতিতে প্রতিফলিত হয়। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে এবং শিল্পোৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
আধুনিক অর্থনীতিতে জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল্য–কাঠামো নির্ধারণের একটি মৌলিক উপাদান।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নির্ধারণ করছে।
নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। শহরের দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। ফলে খাদ্যের সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনতে পারে—পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে ন্যূনতম খাদ্যে নির্ভরশীলতা বাড়ে। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতি, যেখানে উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পুরো অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করে। বাস্তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানে শুধু বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি নয়; এটি পুরো অর্থনীতির ব্যয়–কাঠামোকেই প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা দেশের জ্বালানির সরবরাহকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর শুধু সরবরাহের প্রশ্ন নয়; এটি মূল্য স্থিতিশীলতা, শিল্পোৎপাদন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
শিল্প, বাণিজ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা
জ্বালানিসংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষি খাতে। বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি তৈরি পোশাকশিল্প, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ সরবরাহ করে; কিন্তু গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত হলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শিল্পোৎপাদনের প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়িয়ে দেয়—বিদ্যুৎ, পরিবহন, কাঁচামাল আমদানি ও সরবরাহ শৃঙ্খল—সব ক্ষেত্রেই চাপ সৃষ্টি করে।
বর্তমান বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থায় শিল্পগুলো একটি জটিল সরবরাহ–শৃঙ্খলের অংশ। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু কারখানার বিদ্যুৎ ব্যয়ই বাড়ায় না; এটি আন্তর্জাতিক শিপিং, লজিস্টিক ও কাঁচামাল পরিবহনের খরচও বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
সিমেন্ট, ইস্পাত ও সিরামিকের মতো জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলোও একই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্প ইতিমধ্যে উৎপাদনের সময় কমিয়ে দিয়েছে অথবা নতুন অর্ডার গ্রহণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। পরিবহন খাতে ডিজেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়, যা পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। শেষ পর্যন্ত এই চাপ বহন করতে হয় সাধারণ ভোক্তাকেই। এই বাস্তবতা একটি বড় অর্থনৈতিক সত্য তুলে ধরে—জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মানে শুধু বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি নয়; এর অর্থ পুরো উৎপাদনব্যবস্থার ব্যয়কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।
ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশের জ্বালানি ও রিজার্ভ কতটা চাপেকৃষি খাতেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের সেচব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশই ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ডিজেলের গড় আন্তর্জাতিক মূল্য চলতি মার্চে প্রতি লিটার ১ দশমিক ৩৪ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে বোরো মৌসুমে সেচ ব্যয় ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সঙ্গে সার উৎপাদন ও আমদানির খরচও বাড়ছে। ডিসেম্বর ২০২৫ সালে সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫২ দশমিক ৪৮৩ কোটি টাকা। বিশ্ববাজারে সারের দামের সূচক ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে; যা নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের প্রধান কাঁচামাল। ফলে ভবিষ্যতে সারের মূল্য আরও বৃদ্ধির ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এ পরিস্থিতি ধান, গম ও ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। কৃষকেরা যদি সেচ ও সার ব্যবহারে কাটছাঁট করতে বাধ্য হন, তাহলে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে দেশের খাদ্যনিরাপত্তায়। অর্থাৎ এখনই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলা না গেলেও সেচ ও সার ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনের স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাস্তবে জ্বালানি নিরাপত্তা ও খাদ্যনিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক খাদ্যসংকটে দেখা গিয়েছিল, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভুট্টা ও আখের মতো শস্য বায়োফুয়েল উৎপাদনে বেশি ব্যবহৃত হতে শুরু করে, ফলে খাদ্যের সরবরাহ কমে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। ভবিষ্যতে বায়োফুয়েল উৎপাদনের চাহিদা বাড়লে খাদ্যশস্যের ওপর প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে।
এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—জ্বালানিসংকট শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বা শিল্পের সমস্যা নয়; এটি খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের চলমান খাল পুনঃখনন ও সেচ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও খাদ্যনীতিকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করা অপরিহার্য।
অতএব জ্বালানিসংকট ইতিমধ্যে শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষি খাতে চাপ সৃষ্টি করছে। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো এর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ–শৃঙ্খলে অস্থিরতা ও কৃষি উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে এগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। তাই নীতিনির্ধারকদের এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি, যাতে সম্ভাব্য এই সংকট বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই তা মোকাবিলা করা যায়।
বহিঃখাতের চাপ ও নীতি–চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যা লাখ লাখ পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এই আয়ের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আঞ্চলিক অস্থিরতা বা অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে রেমিট্যান্স প্রবাহ দ্রুত অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। বাস্তবে রেমিট্যান্স শুধু পারিবারিক আয়ের উৎস নয়; এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভরসা; কিন্তু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বৈদেশিক খাতেও চাপ ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার হলেও জ্বালানির আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়লে এই রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করে তোলে। ইতিমধ্যেই দেশের বহিঃঋণ প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, ফলে বৈশ্বিক সুদের হার ও মুদ্রাবাজারের অস্থিরতাও অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে—বহিঃখাতের স্থিতিশীলতা দুর্বল হলে তার প্রভাব দ্রুতই মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ওপর পড়ে।
ইরান যুদ্ধ: বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়েরাজস্ব খাতেও একই ধরনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত প্রায় ৮ শতাংশ, যা উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম নিম্ন। ফলে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক নীতির পরিসর তুলনামূলকভাবে সীমিত। জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি ইতিমধ্যে বিশাল অঙ্কে পৌঁছেছে; মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে; যা রাজস্ব ঘাটতিকে গভীরতর করবে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই একটি কঠিন ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা; অন্যদিকে রাজস্ব স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘ মেয়াদে করভিত্তি সম্প্রসারণ, ভর্তুকিকে লক্ষ্যভিত্তিক করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শেষ পর্যন্ত কেবল সাময়িক নীতির ওপর নির্ভর করে না; এটি শক্তিশালী রাজস্ব কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একই সঙ্গে শ্রমবাজারের বৈচিত্র্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের উদীয়মান শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে রেমিট্যান্স–প্রবাহ আরও স্থিতিশীল হতে পারে এবং একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে।
জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতাও একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় ইতিমধ্যে সীমান্তপারের বিদ্যুৎ–বাণিজ্যের একটি আঞ্চলিক বাজার গড়ে উঠছে। ভারত নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে জলবিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণ করেছে, যা এ অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করছে।
বাংলাদেশও ধীরে ধীরে এই উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে ভারতের ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয়েছে এবং একই বছরের নভেম্বর মাসে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানির উৎসবৈচিত্র্য ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে ভুটানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেও বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ রয়েছে, যা আঞ্চলিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
অতএব বহিঃখাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন কেবল অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্ন নয়; এটি দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
শেষ কথা
ইরান যুদ্ধ হাজার মাইল দূরের হলেও তার অর্থনৈতিক ধাক্কা কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে। তেলের দাম, খাদ্যের খরচ ও প্রবাসী আয়—এই তিন সূচকেই সংকটের প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্ট। সরকার এখন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিই নির্ধারণ করবে এই সংকট অর্থনীতির দুর্বলতা বাড়াবে, নাকি সংস্কারের সুযোগ তৈরি করবে।
করভিত্তি বাড়ানো, ভর্তুকি লক্ষ্যভিত্তিক করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য—এই পদক্ষেপগুলো এখন অপরিহার্য। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কখনোই কাকতালীয় নয়; এটি সচেতন নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ফল। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, অর্থনৈতিক সংকট অনেক সময় সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের সামনে আজ সেই সুযোগ।
● ড. গোলাম রসুল অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা। ই-মেইল: [email protected]
* মতামত লেখকের নিজস্ব