আমিও ‘ছ্যাঁকা খাওয়া’ ছেলেদের শিল্পী হয়ে রইলাম...
· Prothom Alo

বলা যায় তখন ব্যান্ড সংগীতের স্বর্ণসময় ছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে দেশের তরুণ প্রজন্ম তখন মেতে উঠেছে নতুন সুর, নতুন শব্দ আর নতুন কণ্ঠের উন্মাদনায়। সেই সময়ই একেবারে ভিন্ন এক কণ্ঠ নিয়ে শ্রোতাদের সামনে হাজির হন হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল। ভক্তদের মতে, তাঁর কণ্ঠে ছিল বিষণ্নতার কোমল আবহ, ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস আর নিঃসঙ্গতার এক অদ্ভুত আবেদন। তাই খুব অল্প সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন ‘রোমান্টিক-স্যাড’ গানের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখগুলোর একজন।
Visit grenadier.co.za for more information.
সমৃদ্ধ এক সংগীতজীবন, অসংখ্য শ্রোতার ভালোবাসা আর অগণিত স্মৃতি রেখে ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শেষে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে যেন তিনি ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেছেন ভক্ত–অনুরাগীদের স্মরণে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফিরে এসেছেন সেই জুয়েলে, যিনি গান গেয়েছেন হৃদয়ের জন্য, জীবিকার জন্য নয়।
১৯৬৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া জুয়েলের শৈশব কেটেছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। ব্যাংকার বাবার চাকরির কারণে এক জায়গায় বেশি দিন থাকা হয়নি। তবে যেখানেই থাকুন, মা–বাবার উৎসাহেই তাঁর সংগীতের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়। প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রতিবেশী এক শিক্ষকের কাছে গান শেখা শুরু করেন। আর চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথমবার মঞ্চে গান গেয়ে বুঝতে পারেন, সংগীতই হবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে আপন সঙ্গী।
হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল ও আইয়ুব বাচ্চু১৯৮৬ সালে ঢাকায় চলে আসেন জুয়েল। রাজধানীতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি–কেন্দ্রিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। সেখান থেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংগীতাঙ্গনের মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়। ধীরে ধীরে প্রস্তুত হতে থাকে একজন শিল্পীর পথচলা।
সেই পথচলার সবচেয়ে বড় বাঁক আসে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরে। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় জুয়েলের প্রথম একক অ্যালবাম ‘কুয়াশা প্রহর’। সংগীত পরিচালনা করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। শুধু প্রথম অ্যালবামই নয়, জুয়েলের শিল্পীসত্তার দিকনির্দেশনাও দিয়েছিলেন তিনিই।
২০১৭ সালে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জুয়েল বলেছিলেন, ‘আমাকে আবিষ্কার করেছিলেন বাচ্চু ভাই। বলেছিলেন, “গাও।” তিনি বাজিয়েছেন, আমি গেয়েছি। আমার কণ্ঠ শুনে তিনিই ঠিক করে দিয়েছিলেন যে আমাকে “রোমান্টিক-স্যাড ব্যালাড” ধরনের গান গাইতে হবে। প্রথম অ্যালবাম “কুয়াশা প্রহর” করেছিলেন তিনিই।’
সেই শুরু। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। তবে জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গায়ে লেগে যায় একটি বিশেষ পরিচয়। এ প্রসঙ্গে জুয়েল বলেছিলেন, ‘একবার কমেডিয়ান চরিত্রে ভালো করলে সারা জীবন তাকে কমেডিয়ান হিসেবেই কাজ করতে হয়। আমার ক্ষেত্রেও সবাই ধরে নিল, জুয়েলের জন্য এ রকম সুরের গানই করতে হবে। আমিও তেমন “ছ্যাঁকা খাওয়া” ছেলেদের শিল্পী হয়ে রইলাম।’
১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘এক বিকেলে’। এই অ্যালবামই তাঁকে এনে দেয় আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। অ্যালবামটি এতটাই শ্রোতাপ্রিয় হয়েছিল যে অনেকেই তাঁকে ডাকতে শুরু করেন ‘এক বিকেলের জুয়েল’ নামে। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘আমার আছে অন্ধকার’ (১৯৯৫), ‘একটা মানুষ’ (১৯৯৬), ‘দেখা হবে না’ (১৯৯৭), ‘বেশি কিছু নয়’ (১৯৯৮), ‘বেদনা শুধুই বেদনা’ (১৯৯৯), ‘ফিরতি পথে’ (২০০৩), ‘দরজা খোলা বাড়ি’ (২০০৯) এবং ‘এমন কেন হলো’ (২০১৭)। এ ছাড়া ২০১৬ সালে একটি করে গান নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘তাতে কি বা আসে যায়’ এবং ‘এই সবুজের ধানক্ষেত’।
তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত সময়েই অনেকটা আড়ালে চলে যান জুয়েল। তবে এর পেছনে ছিল না কোনো অভিমান, ছিল সচেতন সিদ্ধান্ত। কারণ, গানকে তিনি কখনোই জীবিকার একমাত্র অবলম্বন বানাতে চাননি।
প্রথম আলোকে জুয়েল বলেছিলেন, ‘আমি আসলে কখনোই ফুলটাইম মিউজিশিয়ান ছিলাম না। আমার একটা ভিন্ন ক্যারিয়ার ছিল। গানকে আমি রুটিরুজি করতে চাইনি। কারণ, যখনই কোনো প্রতিষ্ঠান বুঝবে যে গান গেয়ে আপনার বাচ্চার দুধ কিনতে হবে, তখনই সে আপনাকে কোথাও কিনবে, কোথাও বেচবে। আমি তাদের কাছে বিক্রি হতে চাইনি।’
কেন এমন সিদ্ধান্ত, সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন তিনি। ‘আমি বুঝেছি যে তাদের হাতে নিজেকে সঁপে দিলে তারা আমার গানকে নিয়ন্ত্রণ করবে। দেখা যাবে, যেসব গান আমাকে মানায় না, তেমন গানও গাইতে হচ্ছে। তখন আপনারাই বলবেন, আমি কেন এসব গাইলাম? সে জন্য শুরুতেই আমি একটা ভিন্ন ক্যারিয়ার গড়ে নিয়েছি। গান ছিল সেকেন্ডারি।’
হাসান আবিদুর রেজা জুয়েলশুধু কথার কথা নয়, নিজের জীবনেও সে দর্শন মেনে চলেছিলেন জুয়েল। সংগীতশিল্পীর পাশাপাশি তিনি ছিলেন টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা, উপস্থাপক এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট–সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী। তিনি মনে করতেন, আর্থিক নিরাপত্তা থাকলে শিল্পী নিজের শিল্পকে স্বাধীন রাখতে পারেন। তাই জীবিকার জন্য ছিল একটি পেশা, আর হৃদয়ের জন্য ছিল গান।
জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল কঠিন এক যুদ্ধের। ২০১১ সালে তাঁর লিভার ক্যানসার ধরা পড়ে। পরে সেই ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে ফুসফুস ও হাড়েও। দীর্ঘ ১৩ বছর দেশে ও দেশের বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। শারীরিক কষ্ট তাঁকে দুর্বল করেছে, কিন্তু সংগীতের প্রতি ভালোবাসা কখনো ম্লান হয়নি।
২০২৪ সালের ৩০ জুলাই ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই শিল্পী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তান।