বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে, কর্মসংস্থান কি বাড়ছে
· Prothom Alo

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটছে দ্রুত। বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা, বাড়ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে স্নাতক ও সম্মান পড়ার সুযোগ। কিন্তু উচ্চশিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ডিগ্রি অর্জনের সঙ্গে চাকরির নিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে না, উল্টো শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় বেকার থাকছেন।
Visit afsport.lat for more information.
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়া বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৮৫ হাজার। ২০২৪ সালে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ।
অন্যদিকে বিভিন্ন সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বছরে গড়ে প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরির বাজারে বছরে মাত্র তিন লাখের মতো চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে উচ্চশিক্ষা থেকে চাকরির বাজারে প্রবেশ করা তরুণদের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে, পরিবেশ কতটা বাড়ছে
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, জাতীয় সংসদের এক অধিবেশনে প্রায় ১০ জন সংসদ সদস্য তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যেখানে বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১৮৭টি। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৮৮১টি অধিভুক্ত কলেজে স্নাতক (সম্মান) শিক্ষা চালু রয়েছে। ২০২৬ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আবার কলেজ পারফরম্যান্স র্যাঙ্কিং চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালেরর্যাঙ্কিংয়ে ৮৮১টি স্নাতক কলেজের মধ্যে ২৯১টি আবেদন করেছিল; মূল্যায়নের পর জাতীয় পর্যায়ে মাত্র ৮টি এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে মাত্র ৭৬টি কলেজ নির্বাচিত হয়েছিল।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোর মধ্যে রাজশাহী কলেজ সর্বশেষ জাতীয় র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম হয়েছিল। এরপর ছিল সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, আনন্দ মোহন কলেজ ও কারমাইকেল কলেজ। রাজশাহী কলেজ ৭০ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট পেয়ে প্রথম হয়েছিল।
এ থেকে বোঝা যায়, সব কলেজের শিক্ষার পরিবেশ এক নয়। কিছু কলেজে বড় ক্যাম্পাস, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, আবাসিক সুবিধা, সাংস্কৃতিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং অভিজ্ঞ শিক্ষক থাকলেও অধিকাংশ কলেজ এখনো পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গবেষণা ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি।
শুধু ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন দক্ষতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সমস্যাটি শুধু চাকরির সংখ্যা কম হওয়া নয়। শিক্ষা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যেও বড় ধরনের ভিন্নতা রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিডিপি) বিশ্লেষণেও ডিগ্রিধারী বেকারত্ব এবং এর পাশাপাশি দক্ষতা অর্জনের ভিন্নতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের চাকরির উপযোগী দক্ষতার ঘাটতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থী চার বছর বা তার বেশি সময় ধরে পড়াশোনা করে একটি ডিগ্রি অর্জন করলেও যদি তাঁর যোগাযোগদক্ষতা, ইংরেজি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, গবেষণা অভিজ্ঞতা কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা না থাকে, তাহলে সেই ডিগ্রি চাকরির বাজারে প্রত্যাশিত সুবিধা দিতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজের ব্যবধান
একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ শুধু শ্রেণিকক্ষ বা পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণাগার, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, গবেষণা ও প্রকাশনা, যোগ্য শিক্ষক, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ, আবাসিক সুবিধা, ক্লাব ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনের সুযোগ—সব মিলিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ তৈরি হয়।
এই মানদণ্ডে দেশের বিপুলসংখ্যক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি তুলনামূলক ছোট অংশকে শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশসম্পন্ন বলা যায়। গবেষণাভিত্তিক একটি রক্ষণশীল মূল্যায়ন অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৮১টি সম্মান কলেজ মিলিয়ে মাত্র ৩০–৪৫টি প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলকভাবে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়-পরিবেশ রয়েছে। তবে এটি কোনো সরকারি র্যাঙ্কিং বা স্বীকৃত সংখ্যা নয়। বিভিন্ন একাডেমিক, গবেষণা ও অবকাঠামোগত সূচকের ভিত্তিতে করা একটি আনুমানিক মূল্যায়ন।
কর্মক্ষেত্র আপনাকে পরিচয় দিচ্ছে, নাকি পরিচয় কেড়ে নিচ্ছেভবিষ্যৎ দাঁড়াচ্ছে কোথায়
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও শিক্ষার মান ও কর্মসংস্থানের উপযোগিতা একই গতিতে বাড়ছে না। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট বেকার ছিল ২৬ দশমিক ২৪ লাখ মানুষ, যার মধ্যে ৮ দশমিক ৮৫ লাখই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী।
আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পরও অনেকে দীর্ঘ সময় চাকরি পান না। দ্য ডেইলি স্টারের এক সংবাদ বিশ্লেষণে বিবিএসের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট দুই বছর পর্যন্ত চাকরির বাইরে থাকছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি যদি শিক্ষার্থীদের গবেষণা, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়ায়, তাহলে উচ্চশিক্ষার বিস্তার শেষ পর্যন্ত কেবল সনদধারীর সংখ্যা বাড়াবে। প্রয়োজন এমন উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু একটি ডিগ্রি নিয়ে বের হবেন না; বরং চাকরি সৃষ্টি, চাকরি পাওয়ার সক্ষমতা এবং নতুন কিছু করার দক্ষতা নিয়ে বের হবেন।
সভাপতি, ড্যাফোডিল বন্ধুসভা
* মতামত লেখকের নিজস্ব