গোপন রহস্য ফাঁস হতেই নরমাল হয়ে গেল অ্যাবনরমাল! শুরু হলো তুমুল লড়াই
· Prothom Alo

এক নিরুত্তাপ শহর। বরফে ঢাকা। জনসংখ্যা মোটে ১ হাজার ৮৯০। শহরে অপরাধ নেই বললেই চলে, মানুষজন হাসিমুখে কথা বলে, দোকানে নিত্যদিনের কেনাকাটা চলে, স্থানীয় মেয়রও বেশ বন্ধুবৎসল। এমন শহরে নতুন শেরিফের কাজই–বা কী? তেমন কিছু নয়—কাগজপত্রে সই করা, ছোটখাটো ঝামেলা মেটানো আর ছয় সপ্তাহের দায়িত্ব শেষ করে অন্য শহরে চলে যাওয়া। অন্তত উলিসিস রিচার্ডসনের (বব ওডেনকার্ক) পরিকল্পনা এমনই।
কিন্তু শহরের নাম ‘নরমাল’ হলেও এখানকার কিছুই স্বাভাবিক নয়; বরং বরফে ঢাকা এই ছোট শহরের শান্ত মুখোশের নিচে জমে আছে লোভ, অস্ত্র, সহিংসতা, দুর্নীতি আর নানা গোপন হিসাব–নিকাশ। আর সেই গোপন জগতের মাঝখানে এসে পড়েন এমন এক শেরিফ, যিনি নিজের জীবন নিয়েই খুব একটা আশাবাদী নন।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
একনজরেসিনেমা: ‘নরমাল’ধরন: অ্যাকশন–থ্রিলারপরিচালক: বেন হুইটলিঅভিনয়: বব ওডেনকার্ক, হেনরি উইঙ্কলার, লিনা হিডি, রায়ান অ্যালেন, বিলি ম্যাকলেলান, জেস ম্যাকলয়েডস্ট্রিমিং: এইচবিও ম্যাক্সদৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৩১ মিনিট
বেন হুইটলির ‘নরমাল’ সিনেমাটি মূলত অ্যাকশন-কমেডি, তবে এর ভেতরে আছে ছোট শহরের আমেরিকান জীবনের নানা অসংগতির ব্যঙ্গ। ছবির গল্প লিখেছেন ওডেনকার্ক ও ডেরেক কোলস্টাড। অ্যাকশন সিনেমার ভক্তরা জানেন, এই কোলস্টাডই ‘জন উইক’ ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ওডেনকার্কের ‘নোবডি’ ছবিগুলোর চিত্রনাট্যকার। ফলে ‘নরমাল’ দেখতে বসলে ‘নোবডি’ কিংবা ‘জন উইক’-এর ছায়া চোখে পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে এবার ওডেনকার্কের চরিত্রটি অবসরপ্রাপ্ত গুপ্তঘাতক বা সাধারণ চেহারার সুপ্ত অ্যাকশন হিরো নয়। তিনি সত্যিই একজন সাধারণ মানুষ—অন্তত শুরুতে।
‘নরমাল’–এর পোস্টার। আইএমডিবিউলিসিসের জীবনও খুব একটা স্বাভাবিক নেই। স্ত্রী থেকে আলাদা হয়ে আছেন, আগের কর্মস্থলে ঘটে যাওয়া একটি সহিংস ঘটনার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন। নিজের কাজ সম্পর্কে তাঁর দর্শনও বেশ নির্লিপ্ত, ‘জীবন অনেক সহজ হয়, যখন আপনি একটু কম চিন্তা করেন।’ নরমাল শহরেও তাঁর লক্ষ্য খুব সাধারণ: যেভাবে পেয়েছেন, সেভাবেই শহরটিকে রেখে চলে যাবেন।
এই ক্লান্ত, খানিকটা হতাশ, মধ্যবয়সী মানুষটির চরিত্রেই ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ। এই চরিত্রে বব ওডেনকার্ক যথারীতি দুর্দান্ত। ‘বেটার কল সল’-এর শৌল গুডম্যান কিংবা ‘নোবডি’র হাচ ম্যানসেলের মতো চরিত্রে তাঁর যে অস্বস্তিকর, খানিকটা অসহায় হাস্যরস—এখানেও সেটিই কাজ করে। কিন্তু এবার তাঁর শরীরী ভাষায় আছে আরও বেশি ক্লান্তি। তিনি ঝামেলা চান না; পরিস্থিতিই তাঁকে বারবার অ্যাকশনের দিকে ঠেলে দেয়। আর সেখানেই ওডেনকার্কের কমেডি ও অ্যাকশন অভিনয়ের মিশেলটি সবচেয়ে মজার হয়ে ওঠে।
শুরুতেই অবশ্য বোঝা যায়, নরমাল শহরটি যতটা শান্ত দেখাচ্ছে, আসলে ততটা নয়। সদ্য মারা যাওয়া আগের শেরিফের মৃত্যু রহস্যজনক। তাঁর বাড়ি অস্বাভাবিক রকম বড়। পুলিশ বিভাগের অস্ত্রভান্ডারও যেন ছোট শহরের জন্য বেমানান। হার্ডওয়্যার দোকানের তালাবদ্ধ ঘর, পুলিশ স্ক্যানার শুনতে থাকা বৃদ্ধা, স্থানীয় দোকান ও রেস্তোরাঁয় অস্বাভাবিক সংখ্যক বন্দুক—সবকিছু মিলিয়ে উলিসিসের সন্দেহ বাড়তে থাকে।
‘নরমাল’–এর দৃশ্য। আইএমডিবিএর মধ্যেই শহরের ব্যাংকে ডাকাতি করতে আসে দুই ‘হতভাগ্য অপরাধী’। সাধারণ কোনো ব্যাংক ডাকাতির মতো ব্যাপারটি শুরু হলেও এরপর যা ঘটে, তা ছবিটিকে পুরোপুরি অন্যদিকে নিয়ে যায়। শহরের মানুষ, পুলিশ, মেয়র—সবাই যেন একে একে উলিসিসের বিরুদ্ধে চলে যেতে থাকে। ভদ্রতা মুহূর্তেই উধাও হয়ে শুরু হয় বন্দুকযুদ্ধ।
এই জায়গাতেই ‘নরমাল’ উপভোগ্য হয়ে ওঠে। পরিচালক বেন হুইটলি এর আগে ‘ফ্রি ফায়ার’-এ একটি সীমিত জায়গার মধ্যে বন্দুকযুদ্ধকে দুর্দান্ত ব্ল্যাক কমেডি সিকোয়েন্সে পরিণত করেছিলেন। ‘নরমাল’-এও তাঁর সেই পুরোনো মেজাজ ফিরে এসেছে। বরফঝড়, পুলিশের গাড়ির আলো, বিস্ফোরণ, গুলি আর চারপাশে ছিটকে পড়া মানুষ—সব মিলিয়ে অ্যাকশন দৃশ্যগুলো দেখতে মন্দ লাগে না।
কখনো রান্নাঘরের হাতিয়ার দিয়ে মারামারি, কখনো শটগান, কখনো ভারী অস্ত্র—উলিসিসের হাতে যা আসে, সেটিই যেন অস্ত্র হয়ে ওঠে। ওডেনকার্কের মতো দেখতে আপাতনিরীহ একজন মানুষকে কখনো খাবারের দোকানে ভয়ংকর মারামারি করতে, কখনো বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখাই সিনেমাটির বড় ইউএসপি। তাঁর গম্ভীর মুখ আর ভয়াবহ সহিংসতার মধ্যে বৈপরীত্যটি বারবার হাসায়।
‘নরমাল’–এর দৃশ্য। আইএমডিবিতবে ছবির সহিংসতা নিছক বিনোদনের জন্য নয়। ছোট শহরের গল্পের ভেতর দিয়ে নরমাল আমেরিকার কিছু বাস্তব প্রবণতাকেও ব্যঙ্গ করে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, ক্রমবর্ধমান বিভাজন, অস্ত্রের প্রতি অস্বাভাবিক আসক্তি, ‘আমরা বনাম তারা’ ধরনের মানসিকতা—সবকিছুকেই এখানে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে। স্থানীয় বার ও রেস্তোরাঁর দেয়ালজুড়ে শত শত বন্দুক ঝোলানো। উলিসিস জানতে চান, সেগুলো কি সব লোড করা? উত্তরে হাসিমুখে জানানো হয়—লোড করা না থাকলে তো মজাই নেই। ‘নরমাল’–এর কমেডির কোনোটাই প্রায় জোর করে করা হয় না; বরং পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেখায়। ফলে অনেক দৃশ্যই আরও মজার হয়ে ওঠে।
দাম্পত্যের টানাপোড়েন, যৌনতা আর অস্বস্তিকর ডিনার পার্টির গল্পএকই সঙ্গে ছবিটি ‘ফার্গো’র কথাও মনে করিয়ে দেয়। তুষারে ঢাকা মিনেসোটা, শান্ত ছোট শহর, অদ্ভুত মানুষ, অপরাধের আড়ালে থাকা গোপন জগৎ—সব মিলিয়ে কোয়েন ভ্রাতৃদ্বয়ের সিনেমার সঙ্গে মিল অস্বীকার করা যায় না। আগের শেরিফের নামও গন্ডারসন—ফার্গোর ফ্রান্সেস ম্যাকডরম্যান্ড অভিনীত শেরিফের নামের সঙ্গে স্পষ্ট মিল। তবে ‘নরমাল’ ‘ফার্গো’র মতো ডার্ক কমেডির টোনে যায় না; বরং ‘জন উইক’ দুনিয়ার অতিরঞ্জিত অ্যাকশন বা ‘ফ্রি ফায়ার’-এর উন্মুত্তার পথ বেছে নেয়।
ছবির গল্পে রাজনৈতিক ইঙ্গিতও আছে। আগের শেরিফের কিশোর সন্তান অ্যালেক্সের (জেস ম্যাকলয়েড) গল্পের মধ্য দিয়ে শহরের মানুষের নিয়ন্ত্রণপ্রবণতা, সামাজিক বিভাজনও সামনে আনে। পাশাপাশি অস্ত্র, আত্মরক্ষা, সামরিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মেরুকরণের বিষয়গুলোও ছুঁয়ে যায়। ‘নরমাল’ অবশ্য এসব নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেয় না। গুলি চলার শব্দই অনেক সময় সংলাপের জায়গা নিয়ে নেয়।
‘নরমাল’-এর কিছু সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। এতগুলো চরিত্র ও উপকরণ হাজির করা হলেও সব কটির যথেষ্ট বিকাশ হয়নি। উলিসিসের অতীত, তাঁর ভেঙে যাওয়া সংসার, আগের চাকরির ট্র্যাজেডি, অ্যালেক্সের গল্প কিংবা স্থানীয় কিছু চরিত্র—সবকিছুই সম্ভাবনাময়, কিন্তু ছবির ৯০ মিনিটের দৌড়ে অনেক কিছুই ছুঁয়ে চলে যায়। ফলে কিছু আবেগঘন মুহূর্তও পুরোপুরি প্রভাব ফেলতে পারে না। কমেডিও সব সময় সমান কার্যকর নয়। কিছু দারুণ, কিছু আবার বেশ চেনা।
ছবির আরেকটি সমস্যা হলো, এর চমকগুলো অনেকটা আগে থেকেই আন্দাজ করা যায়। তবে ‘নরমাল’ এমন কোনো সিনেমা নয়, যা দর্শককে রহস্য সমাধানের জন্য বসিয়ে রাখে। এর মূল আনন্দ গল্পের চমকের চেয়ে বরং কীভাবে সেই চমকগুলোকে রক্তাক্ত, অদ্ভুত ও হাস্যকর অ্যাকশনে পরিণত করা হচ্ছে, সেখানে।
‘নরমাল’ অ্যাকশন সিনেমা হিসেবে খুব বেশি নতুন কিছু দিতে পারেনি। তবে কিছুটা ডার্ক কমেডি, কিছুটা রোমাঞ্চ, কিছুটা অ্যাকশন আর সঙ্গে বব ওডেনকার্কের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স মিলিয়ে ছবিটি মোটের ওপর উপভোগ্য হয়েছে।