‘নয়া বছরটা হাওরের মানুষের খুব কষ্টে যাইব’

· Prothom Alo

গ্রামের বড় গৃহস্থ আবদুল মালিক (৮৫)। হাওরে ২৯ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে ২০ বিঘাই তলিয়ে গেছে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে। এখন দেনা কীভাবে শোধ করবেন আর বছর কীভাবে যাবে চিন্তা পেয়ে বসেছে তাঁকে।

Visit extonnews.click for more information.

কৃষক আবদুল মালিকের বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও গ্রামে। গ্রামের পাশের দেখার হাওরে তাঁদের সব জমি। এটি সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় ধানের হাওর। প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয় এই হাওরে।

দূর থেকে হাওরে তলিয়ে যাওয়া তাঁর জমির স্থানটি দেখিয়ে আফসোস করছিলেন আবদুল মালিক। বলছিলেন, ‘আর কয়টা দিন পাইলেই অইত। কিন্তু পাইড়া ঢলের পানি সব ডুবাইলিছে। পানির নিচের ধান আর কাটা সম্ভব না। সব পচি যাইবো।’

মালিক জানালেন, বাকি ৯ বিঘা জমির মধ্যে চার বিঘার ধান কেটেছিলেন তিন দিন আগে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেই ধান মাড়াই করার পর শুকাতে পারেননি। স্তূপ করে রেখেছিলেন। আর বাকি পাঁচ বিঘা জমির ধান এখনো পুরোপুরি পাকেনি। তবু কাটার চেষ্টা করছেন। কিন্তু শ্রমিক মিলছে না। এক হাজার টাকা মজুরিতে চারজন শ্রমিক নিয়েছেন। সঙ্গে আছে তাঁর ছেলেরা।

সব জমির ধান ভালোয় ভালোয় তুলতে পারলে প্রায় চার শ মণ ধান পেতেন এই কৃষক। এখন যে জমি আছে, তাতে ৬০ থেকে ৭০ মণ পাওয়ার আশা করছেন। এই ধান কাটা ও মাড়াই করতে পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। আবহাওয়া ভালো থাকলে সহজেই কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে কম সময়ে ধান কেটে ফেলতেন। এবার শুরুতেই বৃষ্টিতে জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, তাই মেশিন চলেনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে যখন আবদুল মালিকের সঙ্গে কথা হয়, তখন তাঁর সঙ্গে নাতি লিকসন মিয়া (১৮) ছিলেন। হাওরপারে পলিথিনের চটের ওপর ভেজা ধান শুকাতে দিয়েছেন তাঁরা। সেই ধান নাড়ছিলেন এক নারী। এর আগে সকালে জমি থেকে ধান কেটে এনেছেন। শুকাতে দেওয়া ধান তিন দিন ধরে স্তূপ করে রাখা ছিল। রোদ না থাকায় শুকানো যায়নি। এই তিন দিন আবহাওয়া এমনই খারাপ ছিল, তখন হাওরে বের হওয়াটাই ছিল মুশকিল। তুমুল বৃষ্টি, বজ্রপাত আর কনকনে ঠান্ডা বাতাসে ভয়ার্ত পরিবেশ ছিল হাওরজুড়ে। সেই সঙ্গে উজানের পাহাড়ি ঢলে পানি বাড়ছিল নদী ও হাওরে। তলিয়ে যাচ্ছিল হাওরের জমির ধান। চোখের সামনে জমির ধান তলিয়ে গেলেও তাঁরা অসহায় ছিলেন বলে জানালেন আবদুল মালিক।

টানা বৃষ্টির কারণে শুকাতে না পারা ধানে পচন ধরেছে। সেটি দেখাচ্ছেন কৃষক আবদুল মালিক। সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে বৃহস্পতিবার বিকেলে

আলাপকালে জানা যায়, আবদুল মালিকের পরিবারে ২২ জন মানুষ। একান্নবর্তী পরিবার। তাঁর চার ছেলে ও চার মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। এখন চার ছেলের স্ত্রী ও সন্তানেরা আছেন। নিজের জমির পাশাপাশি চুক্তিতে আরও কিছু জমি আবাদ করেন তাঁরা। চুক্তি অনুযায়ী এককালীন টাকা দিতে হয়। জমির ধান না পেলেও চুক্তির টাকা আর ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হাওরের এই ধানের ওপরই সব নির্ভর করে তাঁদের। সংসারের পুরো এক বছরের খাওয়ার পাশাপাশি সব খরচ জোগাতে হয় ধান বিক্রি থেকে। কিন্তু এবার অন্য খরচ মেটানো তো দূরের কথা, ঘরের মানুষের বছরের খাবারের ধানই মিলছে না।

আবদুল মালিক বলছিলেন, জমি আবাদ করতে শ্রমিক, সার-বীজ, কীটনাশক, সেচসহ আনুষঙ্গিক খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকার মতো। নিজের কিছু সঞ্চয় ছিল, বাকিটা দেনা করতে হয়েছে। এমনটা প্রতিবছরই করতে হয়। বৈশাখে আবার নতুন ধান তুলে সেই ধান বিক্রি করে সব দেনা মিটিয়ে দেন তিনি। কিন্তু এবার তো হাত প্রায় খালি। কী করবেন, কীভাবে চলবেন বুঝতে পারছেন না।

পাশে থাকা নাতি লিকসন মিয়া বলছিলেন, হাওরের উঁচু অংশে তাঁদের জমি। এভাবে বৃষ্টি আর ঢলের পানিতে এই জমি তলিয়ে যাবে সেটি তাঁরা ভাবতে পারেননি। গত সোমবার তাঁরা জমিতে হাঁটুসমান পানি রেখে যান। পরের দিন মঙ্গলবার সকালে এসে দেখেন হাওর পানিতে ভরা, সব সাদা হয়ে আছে। জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

নাতির কথা শেষ হতেই আবদুল মালিক বলেন, ‘শুধু আমরা না, হাওরে ইবার বউত কৃষকের ধান পানিতে তলাই গেছে। অনেকে তো কান্দের (কাঁদছে)। অনেকের উগার (ধান রাখার গোলা) খালি থাকব। ইবার বৈশাখের শুরু থাকিই দুর্যোগ শুরু অইছে। বুঝলাম, নয়া বছরটা হাওরের মানুষের খুব কষ্টে যাইব।’

Read full story at source